সমাস ‍কি - সমাস কত প্রকার

বাংলা ব্যাকরণ এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সমাস। সাধারণত বাংলা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষায় সমাস কি? সামাস কত প্রকার? এ ধরনের প্রশ্ন করা হয়। এখানে সমাস কি? ও সমাস কত প্রকার? বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

সমাস কি? সমাস কত প্রকার?

পরস্পর অর্থসঙ্গতি বিশিষ্ট দুই বা ততোধিক পদের বিভক্তি লোপ করে একটি বৃহৎ শব্দ সৃষ্টি করার নাম সমাস। সমাস করার ফলে যে পদের উৎপন্ন হয় তাকে সমাসবদ্ধ পদ বলে। যে যে পদ নিয়ে সমস্তপদ গঠিত হয় তাদেরকে সমস্যমান পদ বলে। পদগুলো পরস্পর অর্থ সঙ্গতি বিশিষ্ট না হলে সমাস হয় না। সমাস প্রধানত ছয় প্রকার। যথা- ১. দ্বন্দ্ব সমাস, ২. অব্যয়ীভাব সমাস, ৩. তৎপুরুষ সমাস, ৪. কর্মধারয় সমাস, ৫. দ্বিগু সমাস ও ৬. বহুব্রীহি সমাস। এছাড়া অলুক সমাস, প্রাদি সমাস প্রভৃতি আরও কয়েকটি সমাস আছে।

IMAGENAME

দ্বন্দ্ব সমাস

যে সমাসে পূর্বপদ ও পরপদ- উভয় পদের অর্থই প্রধান থাকে, তাকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমনঃ বাবা ও মা = বাবা-মা, মশা ও মাছি = মশামাছি, রাজা ও রানি = রাজা রানি ইত্যাদি। এখানে 'দ্বন্দ্ব' কথাটির অর্থ হচ্ছে মিলন। সংযোজক অব্যয়- এবং, আর, ও ইত্যাদির মাধ্যমে দুটি পদ একত্রিত হয়ে একপদে পরিণত হয় এবং পদটি দুটি পদের অর্থ একসঙ্গে প্রকাশ করে। যেমন: আলো ও ছায়া = আলোছায়া। আলোছায়া বললে আলোও বোঝায়, ছায়াও বোঝায়। দ্বন্দ্ব সমাস বিভিন্ন প্রকার-

১. সাধারণ দ্বন্দ্ব : দুটো সাধারণ পদ একসঙ্গে মিলিত হয়ে সমাস হলে তাকে সাধারণ দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন: নদী ও নালা = নদীনালা, পথ ও ঘাট = পথঘাট ইত্যাদি।

২. মিলনার্থক দ্বন্দ্ব : দুটি পদের একত্র মিলন বোঝেলে তাকে মিলনার্থক দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন: ছাত্র ও ছাত্রী = ছাত্রছাত্রী, ভাই ও বোন = ভাইবোন ইত্যাদি।

৩. সমার্থক দ্বন্দ্ব : একই অর্থ প্রকাশক শব্দে সমাস হলে তাকে সমার্থক দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন: হাট ও বাজার = হাটবাজার, ধন ও দৌলত = ধনদৌলত, লাজ ও লজ্জা = লাজলজ্জা।

৪. বিপরীতার্থক দ্বন্দ্ব : দুটি পদে বিপরীতধর্মী বিষয় বোঝালে তাকে বিপরীতার্থক দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন: ধনী ও গরিব = ধনীগরিব, দিন ও রাত = দিনরাত, সাদা ও কালো = সাদাকালো ইত্যাদি।

৫. একশেষ দ্বন্দ্ব : যে দ্বন্দ্ব সমাসে প্রধান পদটি অবশিষ্ট থেকে অন্য পদের লোপ হয় এবং শেষ পদ অনুসারে শব্দ গঠিত হয়, তাকে একশেষ দ্বন্দ্ব সমাস বলে। সে, তুমি ও আমি = আমরা, সে ও তুমি = তোমরা।

৬. বহুপদী দ্বন্দ্ব : তিন বা বহুপদ মিলিত হয়ে সমাস হলে তাকে বহুপদী দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন: সাহেব, বিবি ও গোলাম = সাহেব বিবি গোলাম। রূপ, রস, শব্দ, স্পর্শ ও গন্ধ = রূপ-রস-শব্দ-স্পর্শ-গন্ধ ইত্যাদি।

৭. অলুক দ্বন্দ্ব : যে দ্বন্দ্ব সমাসে বিভক্তি লোপ পায় না, তাকে অলুক দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন: কাগজে ও কলমে = কাগজে কলমে, দুধে ও ভাতে = দুধেভাতে, মায়ে ও ঝিয়ে = মায়েঝিয়ে ইত্যাদি। অলুক অর্থ- লোপ না পাওয়া।

অব্যয়ীভাব সমাস

যে সমাসের পূর্বপদে অব্যয় থাকে এবং অব্যয়ের অর্থই প্রধান থাকে, তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে। যেমন: ভিক্ষার অভাব = দুর্ভিক্ষ, ঘরের অভাব = হাঘর, জীবন পর্যন্ত = আজীবন, সমুদ্র পর্যন্ত = আসমুদ্র, কণ্ঠের সমীপে = উপকণ্ঠ, দিন দিন = প্রতিদিন, পা থেকে মাথা পর্যন্ত = আপাদমস্তক, রোজ রোজ = হররোজ, শৃঙ্খলাকে অতিক্রান্ত = উশৃঙ্খল, ভাবনার অভাব = নির্ভাবনা, জলের অভাব = নির্জলা, সাধ্যকে অতিক্রম না করে = যথাসাধ্য, বনের সমীপে = উপবন, মরণ পর্যন্ত = আমরণ ইত্যাদি।

তৎপুরুষ সমাস

যে সমাসে পরপদের অর্থ প্রধান বলে বিবেচিত হয়, তাকে তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন- রাতে কানা = রাতকানা, গালে ভরা = গালভরা, ভোজনে বিলাসী = ভোজনবিলাসী ইত্যাদি। তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদের বিভক্তি লোপ পায়। বৃত্তিকে প্রাপ্ত = বৃত্তিপ্রাপ্ত। এখানে 'বৃত্তিকে' পূর্ব পদের 'কে' বিভক্তি লোপ পেয়েছে।

তৎপুরুষ সমাসের শ্রেণিবিভাগ

তৎপুরুষ সমাস নানা প্রকার হতে পারে। যেমন:

১. দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস : পূর্বপদের দ্বিতীয়া বিভক্তি (কে, রে) লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস গঠিত হয়, তাকে দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: মাকে হারা = মা হারা, রতকে দেখা = রথদেখা, গাকে ঢাকা = গা ঢাকা, কলাকে বেচা = কলাবেচা, দুঃখকে প্রাপ্ত = দুঃখপ্রাপ্ত, পরলোকে গত = পরলোকগত, ব্যক্তিকে গত = ব্যক্তিগত, পুঁথিকে গত = পুঁথিগত, সাহায্যকে প্রাপ্ত = সাহায্যপ্রাপ্ত, চরণকে আশ্রিত = চরণাশ্রিত, বিপদে আপন্ন = বিপদাপন্ন, বর্ণনাকে অতীত = বর্ণনাতীত, চিরকাল ব্যাপিয়া সুখী = চিরসুখী, ক্ষণকাল ব্যাপিয়া স্থায়ী = ক্ষণস্থায়ী, দ্রুত যথা তথা গামী = দ্রুতগামী, ছেলেকে ভুলানো = ছেলেভুলানো।

২. তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস : পূর্বপদের তৃতীয়া বিভক্তি (দ্বারা, দিয়া, কর্তৃক) লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয়, তাকে তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: মন দ্বারা গড়া = মনগড়া, মধু দিয়ে মাখা = মধুমাখা, শ্রম দ্বারা লব্ধ = শ্রমলব্ধ, বিদ্যা দ্বারা হীন = বিদ্যাহীন, জ্ঞান দ্বারা শূণ্য = জ্ঞানশূণ্য, অস্ত্র দ্বারা আঘাত = অস্ত্রাঘাত, ছাই দ্বারা চাপা = ছাইচাপা, আনন্দ দ্বারা পূর্ণ = আনন্দপূর্ণ, বায়ু দ্বারা চালিত = বায়ুচালিত, কণ্টক দ্বারা আকীর্ণ = কণ্টকাকীর্ণ, ছায়া দ্বারা আচ্ছন্ন = ছায়াচ্ছন্ন, চন্দন দ্বারা চর্চিত = চন্দনচর্চিত, হীরক দ্বারা খচিত = হীরকখচিত, ছুরি দ্বারা আঘাত = ছুরিকাঘাত, ঢেঁকি দ্বারা ছাটা = ঢেঁকিছাটা।

৩. চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস : যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদের চতুর্থী বিভক্তি (কে, রে) জন্য নিমিত্ত লোপ পায় তাকে চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: গুরুকে ভক্তি = গুরুভক্তি, আরামের জন্য কেদারা = আরামকেদারা, বিয়ের জন্য পাগল = বিয়েপাগল, বসতের জন্য বাড়ি = বসতবাড়ি, বিদ্যার জন্য আলয় = বিদ্যালয়, মালের জন্য গাড়ি = মালগাড়ি, মড়ার জন্য কান্না = মড়াকান্না, ডাকের জন্য মাশুল = ডাকমাশুল, কিশোরদের জন্য পত্রিকা = কিশোরপত্রিকা, হজ্বের জন্য যাত্রা = হজ্বযাত্রা, মালের জন্য গুদাম = মালগুদাম, স্বদেশের জন্য প্রেম = স্বদেশপ্রেম, রান্নার জন্য ঘর = রান্নাঘর, শয়নের নিমিত্ত কক্ষ = শয়নকক্ষ।

৪. পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস : যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদের পঞ্চমী বিভক্তি (হতে, থেকে) লোপ পায় তাকে পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: আদি থেকে অন্ত = আদ্যন্ত, জন্ম থেকে অন্ধ = জন্মান্ধ, পদ হতে চ্যুত = পদচ্যুত, বিলাত থেকে ফেরত = বিলাতফেরত, পথ থেকে ভ্রষ্ট = পথভ্রষ্ট, দুগ্ধ থেকে জাত = দুগ্ধজাত, জেল থেকে পালানো = জেলপালানো, বন্ধন থেকে মুক্ত = বন্ধনমুক্ত, স্কুল থেকে পালানো = স্কুল পালানো, কৃষি থেকে জাত = কৃষিজাত, স্নেহ থেকে বঞ্চিত = স্নেহবঞ্চিত, হাত থেকে ছাড়া = হাতছাড়া, স্বর্গ থেকে চ্যুত = স্বর্গচ্যুত, রোগ থেকে মুক্ত = রোগমুক্ত।

৫. ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস : পূর্বপদের ষষ্ঠী বিভক্তিচিহ্ন (র, এর) লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয়, তাকে ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: বঙ্গের বন্ধু = বঙ্গবন্ধু, রাজার পুত্র = রাজপুত্র, বিড়ালের ছানা = বিড়ালছানা, খেয়ার ঘাট = খেয়াঘাট, পিতার ধন = পিতৃধন, মাতার সেবা = মাতৃসেবা, হাঁসের রাজা = রাজহাঁস, ছাত্রের বৃন্দ = ছাত্রবৃন্দ, রাজার কন্যা = রাজকন্যা, ছাগীর দুগ্ধ = ছাগদুগ্ধ, হংসীর ডিম্ব = হংসডিম্ব।

৬. সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস : যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদের সপ্তমী বিভক্তি (এ, তে, য়, এতে, মধ্যে) লোপ পায়, তাকে সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: দিবায় নিদ্রা = দিবানিদ্রা, বিশ্বের মধ্যে বিখ্যাত = বিশ্ববিখ্যাত, পুরুষের মধ্যে উত্তম = পুরুষোত্তম, সাহিত্যে বিশারদ = সাহিত্য-বিশারদ, পূর্বে ভূত = ভূতপূর্ব, দানে বীর = দানবীর, সংখ্যায় গরিষ্ঠ = সংখ্যাগরিষ্ঠ, গাছে পাকা = গাছপাকা, গলাতে ধাক্কা = গলাধাক্কা, বস্তায় পঁচা = বস্তাপঁচা, মনে মরা = মনমরা, বাক্সে বন্দি = বাক্সবন্দি, গৃহে বন্দি = গৃহবন্দি, পাঠে রত = পাঠরত।

৭. নঞ তৎপুরুষ সমাস : পূর্বপদে নঞর্থক বা নিষেধার্থক অব্যয় (না, নয়, অ, অন, নি, নেই) ব্যবহৃত হয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয়, তাকে নঞ তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: নাই মিল = অমিল, নয় রাজি = নারাজ, নাই আশা = নিরাশা, নাই শৃঙ্খলা = বিশৃঙ্খলা, না জানা = অজানা, নেই খুঁত = নিখুঁত, খ্যাত নয় = অখ্যাত, উর্বর নয় = অনুর্বর, জোড় নয় = বেজোড়, ভদ্র নয় = অভদ্র, জ্ঞাত নয় = অজ্ঞাত, ম্লান নয় = অম্লান, প্রিয় নয় = অপ্রিয়, নয় ধোয়া = আধোয়া, বে (নেই) হায়া = বেহায়া, নাই লাজ = নিলাজ ইত্যাদি।

৮. অলুক তৎপুরুষ সমাস : পূর্বপদের বিভক্তি লোপ না পেয়ে তৎপুরুষ সমাস হরে তাকে অলুক তৎপুরুষ সমাস বলে। অলুক শব্দের অর্থ- অ-লোপ, অর্থাৎ লোপ না হওয়া। যেমন: চিনির বলদ = চিনির বলদ, ঘিয়ে ভাজা = ঘিয়ে ভাজা, ঘোড়ার ডিম = ঘোরার ডিম, সোনার তরী = সোনার তরী, খেলার জন্য মাঠ = খেলার মাঠ, গায়ের জন্য চাদর = গায়ের চাদর, তাসের ঘর = তাসের ঘর, মগের মুল্লুক = মগের মুল্লুক, গোড়ায় গলদ = গোড়ায় গলদ, সোনায় সোহাগা = সোনায় সোহাগা, ডুমুরের ফুল = ডুমুরের ফুল, অরণ্যে রোদন = অরণ্যে রোদন, খবরের কাগজ = খবরের কাগজ, পড়ার জন্য টেবিল = পড়ার টেবিল।

৯. প্রাদি সমাস : তৎপুরুষ সমাসে প্র, অতি ইত্যাদি উপসর্গ বিশেষ অর্থে পূর্বপদ হিসেবে ব্যবহৃত হলে তাকে প্রাদি সমাস বলে। যেমন: প্র (প্রকৃষ্টরূপে) ভাত = প্রভাত, প্রগতি = প্রগতি, কু (কুৎসিত) পুরুষ = কাপুরুষ, অতি প্রাকৃত = অতিপ্রাকৃত ইত্যাদি।

কর্মধারয় সমাস

বিশেষ্য ও বিশেষণ পদের যে সমাস হয় এবং পরপদের অর্থ প্রাধান্য পেলে তাকে কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন: সু যে পুুরুষ = সুপুরুষ, যিনি লাট তিনিই সাহেব = লাটসাহেব, যা কাঁচা তা-ই মিঠা = কাঁচামিঠা, যে চালাক সেই চতুর = চালাকচতুর।
কর্মধারয় সমাস বিভিন্নভাবে গঠিত হতে পারে। যেমন:

ক. উভয়পদ বিশেষ্য : পুরুষ যে মানুষ = পুরুষমানুষ, যিনি ডাক্তার তিনিই সাহেব = ডাক্তার সাহেব ইত্যাদি।

খ. উভয়পদ বিশেষণ : যা সাদা তাই কালো = সাদাকালো, যে নীল সে-ই লোহিত = নীললোহিত।

গ. পূর্বপদ বিশেষণ, পরপদ বিশেষ্য : নীল যে উৎপল = নীলোৎপল, ভাজা যে পটল = পটল ভাজা ইত্যাদি।

কর্মধারয় সমাস কয়েক শেণিতে বিভক্ত। যেমন:

১. মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস : ব্যাসবাক্যের মধ্যকার পদটি লোপ পেয়ে যে কর্মধারয় সমাস হয়, তাকে মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন: পল মিশ্রিত অন্ন = পলান্ন, স্বর্ণ নির্মিত মন্দির = স্বর্ণমন্দির, শোক প্রকাশের সভা = শোকসভা, মূক সেজে অভিনয় = মূকাভিনয়, ঘোড়া চালিত গাড়ি = ঘোড়ার গাড়ি, এক অধিক দশ = একাদশ, হাতে পরার ঘড়ি = হাতঘড়ি, স্মৃতি রক্ষার্থে সৌধ = স্মৃতিসৌধ, সাহিত্য বিষয়ক সভা = সাহিত্যসভা, সিংহ চিহ্নিত আসন = সিংহাসন, জীবনের জন্য বিমা = জীবনবিমা, ছায়া প্রধান তরু = ছায়াতরু, মোম নির্মিত বাতি = মোমবাতি, পানা ভরা পুকুর = পানাপুকুর, স্বর্ণের ন্যায় উজ্জ্বল অক্ষর = স্বর্ণাক্ষর, রাষ্ট্র সম্পর্কিত নীতি = রাষ্ট্রনীতি।

২. উপমান কর্মধারয় সমাস : উপমান পদের সঙ্গে সাধারণ ধর্মের যে সমাস হয় তাকে উপমান কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন: গোরুর ন্যায় বেচারা = গোবেচারা, বজ্রের ন্যায় কঠিন = বজ্রকঠিন, তুষারের ন্যায় শুভ্র = তুষারশুভ্র ইত্যাদি। উল্লেখ্য, কোন কিছুকে যার সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাকে উপমান পদ, যাকে তুলনা করা হয় তাকে উপমেয় বা উপমিত পদ এবং যে বৈশিষ্ট্যের জন্য তুলনা করা হয় তাকে সাধারণ ধর্ম বলে। যেমন: কাজল কালো মেঘ। এখানে কাজলের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে বলে 'কাজল' উপমেয় পদ। কালো রঙের জন্য তুলনা করা হয়েছে বলে 'কালো' হচ্ছে সাধারণ ধর্ম বা গুণ। সাধারণ ধর্ম বা গুণের সঙ্গে উপমান ও উপমেয় পদের সম্পর্কের বিবেচনায় কর্মধারয় সমাসের শ্রেণিবিভাগ হয়। অনুরূপভাবে, বকের মতো ধার্মিক = বকধার্মিক, নিমের মতো তিতা = নিমতিতা, কাজলের মতো কালো = কাজলকালো, হরিণের মতো চপল = হরিণচপল, অরুণের ন্যায় রাঙা = অরুণরাঙা, গজের ন্যায় মূর্খ = গজমূর্খ, শশকের ন্যায় ব্যস্ত = শশব্যস্ত, বিড়ালের ন্যায় তপস্বী = বিড়ালতপস্বী, কুসুমের ন্যায় কোমল = কুসুমকোমল, মিশির ন্যায় কালো = মিশকালো, ঘনের ন্যায় শ্যাম = ঘনশ্যাম, বজ্রের ন্যায় কণ্ঠ = বজ্রকণ্ঠ।

৩. উপমিত কর্মধারয় সমাস : যে কর্মধারয় সমাসে পূর্বপদে উপমেয় এবং উত্তরপদে বা পরপদে উপমান থাকে আর সাধারণ ধর্ম বা গুণের উল্লেখ থাকে না, তাকে উপমিত কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন: মুখ চন্দ্রের ন্যায় = চন্দ্রমুখ, পুরুষ সিংহের ন্যায় = পুরুষসিংহ, চরণ কমলের ন্যায় = চরণকমল, ফুলের ন্যায় কুমারী = ফুলকুমারী, কদমের ন্যায় ছাঁট = কদমছাঁট, অধর পল্লবের ন্যায় = অধরপল্লব, চাঁদ বদনের ন্যায় = চাঁদবদন, হাঁড়ির ন্যায় মুখ = হাঁড়িমুখ, সোনার তুল্য মুখ = সোনামুখ, রাজা ঋষি তুল্য = রাজর্ষি, কর কমলের ন্যায় = করকমল, বাহুলতার ন্যায় = বাহুলতা, কথা অমৃতের ন্যায় = কথামৃত, নয়ন পদ্মের ন্যায় = নয়নপদ্ম।

৪. রূপক কর্মধারয় সমাস : যে কর্মধারয় সমাসে পূর্বপদে উপমেয় ও উত্তরপদে উপমান থাকে এবং উভয়ের মধ্যে সাদৃশ্য না বুঝিয়ে অভেদ কল্পনা করা হয়, তাকে রূপক কর্মধারয় সমাস বলে। এই সমাসে পূর্বপদ ও পরপদ দুটোই বিশেষ্য পদ হয়ে থাকে। যেমন: মন রূপ মাঝি = মনমাঝি, প্রাণ রূপ পাখি = প্রাণপাখি, শোক রূপ সাগর = শোকসাগর, বিষাদ রূপ সিন্ধু = বিষাধসিন্ধু, ক্রোধ রূপ অনল = ক্রোধানল, স্নেহ রূপ সুধা = স্নেহসুধা, ভব রূপ নদী = ভবনদী, জীবন রূপ তরী = জীবনতরী, বিদ্যা রূপ ধন = বিদ্যাধন, ক্ষুধা রূপ অনল = ক্ষুধানল, সুখ রূপ সাগর = সুখসাগর, কাল রূপ চক্র = কালচক্র, স্নেহ রূপ নীড় = স্নেহনীড়।

দ্বিগু সমাস

সংখ্যাবাচক শব্দ পূর্বে বসে যে সমাস সমষ্টি বা সমাহার বোঝায়, তাকে দ্বিগু সমাস বলে। যেমন: নব (নয়) রত্নের সমাহার = নবরত্ন, শত অব্দের (বর্ষের) সমাহার = শতাব্দী, ত্রি (তিন) ফলের সমাহার = ত্রিফলা ইত্যাদি। দ্বিগু সমাসে প্রথমে একটি সংখ্যাবাচক শব্দ বসে এবং শব্দটিতে সমষ্টি বোঝাবে। অনুরূপভাবে, চার মাথার সমাহার = চৌমাথা, সাত সমুদ্রের সমাহার = সাতসমুদ্র, চৌ (চার) রাস্তার সমাহার = চৌরাস্তা, ছয় ঋতুর সমাহার = ষড়ঋতু, তিন (সে) তারের সমাহার = সেতারা, তিন ফলের সমাহার = ত্রিফলা, নয় রত্নের সমাহার = নবরত্ন, পঞ্চনদের সমাহার = পঞ্চনদ, তিন পদের সমাহার = ত্রিপদী, শত শব্দের সমাহার = শতাব্দী, ত্রি (তিন) ভুজের সমাহার = ত্রিভুজ ইত্যাদি।

বহুব্রীহি সমাস

যে সমাসে পূর্বপদ বা পরপদ কোনটির অর্থ না বুঝিয়ে অন্য কোন অর্থ বোঝায়, তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন: লাল পাড় যার = লালপেড়ে, দশ আনন যার = দশানন, কমলের ন্যায় অক্ষি যার = কমলাক্ষি, পদ্ম নাভিতে যার = পদ্মনাভ ইত্যাদি।

বহুব্রীহি সমাস নানারকম হতে পারে। যেমন:

১. সামানাধিকরণ বহুব্রীহি : যে বহুব্রীহি সমাসে পূর্বপদ বিশেষণ এবং পরপদ বিশেষ্য থাকে, তাকে সামানাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন: পোড়া মুখ যার = মুখপোড়া, সমান উদর যার = সহোদর, সুন্দর বর্ণ যার = সুবর্ণ, খোশ মেজাজ যার = খোশমেজাজী, বদ মেজাজ যার = বদমেজাজী, অল্প বয়স যার = অল্পবয়সী, তীক্ষ্ন বুদ্ধি যার = তীক্ষ্নবুদ্ধি, দৃঢ় প্রতিজ্ঞ যে = দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, কান কাটা যার = কানকাটা, শান্তিপ্রিয় যে = শান্তিপ্রিয়, হত হয়েছে শ্রী যার = হতশ্রী, পেটমোটা যার = পেটমোটা, উচ্চশির যার = উচ্চশির, স্বল্প আয়ু যার = স্বল্পায়ু, কৃতকার্য যে = কৃতকার্য ইত্যাদি।

২. ব্যধিকরণ বহুব্রীহি : পূর্বপদ বিশেষ্য এবং পরপদ ক্রিয়াবাচক হলে ব্যধিকরণ বহুব্রীহি সমাস হয়। যেমন: পিছে পা যার = পিছপা, বীণা পানিতে যার = বীণাপানি, শশ অঙ্কে যার = শশাঙ্ক, কথা সর্বস্ব যার = কথাসর্বস্ব, অন্যদিকে মন যার = অন্যমনা, আশীতে বিষ যার = আশীবিষ, নীল কণ্ঠ যার = নীলকণ্ঠ, শূল পানিতে যার = শূলপানি, রত্ন গর্ভে যার = রত্নগর্ভা, কর্ণে ফুল যার = কর্ণফুলি, ক্ষণে জন্ম যার = ক্ষণজন্মা, খড়গ হস্তে যার = খড়গহস্ত, ছাতা হাতে যার = ছাতাহাতে, গৌর অঙ্গ যার = গৌরাঙ্গ, ক্ষীণ প্রভা যার = ক্ষীণপ্রভা।

৩. ব্যতিহার বহুব্রীহি : যে বহুব্রীহি সমাসে একই রকম বিশেষ্য পদ দিয়ে একজাতীয় কাজ বুঝিয়ে থাকে, তাকে ব্যতিহার বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন: কানে কানে যে কথা = কানাকানি, কোলে কোলে যে মিলন = কোলাকুলি, চোখে চোখে যে দেখা = চোখাচোখি, হেসে হেসে যে আলাপ = হাসাহাসি, হাতে হাতে যে যুদ্ধ = হাতাহাতি, লাঠিতে লাঠিতে যে যুদ্ধ = লাঠালাঠি, দণ্ডে দণ্ডে যে যুদ্ধ = দণ্ডযুদ্ধ, চুলে চুলে যে ঝগড়া = চুলাচুলি, দেখে দেখে যে কাজ = দেখাদেখি, ঘুষা ঘুষিতে যে যুদ্ধ = ঘুষাঘুষি, গলায় গলায় যে ভাব = গলাগলি, ঠেলায় ঠেলায় যে যুদ্ধ = ঠেলাঠেলি, দলে দলে যে ঝগড়া = দলাদলি।

৪. মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি : যে বহুব্রীহি সমাসে ব্যাসবাক্যের ব্যাখ্যামূলক মধ্যবর্তী পদ লুপ্ত হয়, তাকে মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন: সোনার মত উজ্জ্বল মুখ যার = সোনামুখী, এক দিকে চোখ যার = একচোখা, পদ্মের ন্যায় গন্ধ = পদ্মগন্ধা, স্বর্ণের আভার মতো আভা যার = স্বর্ণাভ, বিড়ালের ন্যায় চোখ যে নারীর = বিড়ালচোখী, মীনের ন্যায় অক্ষি যার = মীনাক্ষী, মৃগের নয়নের ন্যায় নয়ন যার = মৃগনয়না, ঘরের দিকে মুখ যার = ঘরমুখী, রণের দিকে মুখ যার = রণমুখী, মেঘের মতো নাদ যার = মেঘনাদ, চন্দ্রের ন্যায় বদন যার = চন্দ্রবদনা, বজ্রের ন্যায় কণ্ঠ যার = বজ্রকণ্ঠ, পদ্মের ন্যায় মুখ যে নারীর = পদ্মমুখী ইত্যাদি।

৫. নঞ বহুব্রীহি : যে বহুব্রীহি সমাসে পূর্বপদে নঞর্থক বা নিষেধার্থক অব্যয় থাকে, তাকে নঞ বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন: নাই ভুল যাতে = নির্ভুল, নাই ঈমান যার = বেঈমান, নেই বুঝ যার = অবুঝ, নেই বোধ যার = নির্বোধ, নাই লজ্জা যার = নির্লজ্জ, বে (নাই) হায়া যার = বেহায়া, ন (নাই) জ্ঞান যার = অজ্ঞান, সীমা নাই যার = অসীম, নি (নাই) প্রাণ যার = নিষ্প্রাণ, বে (নাই) আক্কেল যার = বেআক্কেল, বে (নাই) আদব যার = বেআদব, বে (নাই) তার যার = বেতার, বি (নাই) দোষ যার = নির্দোষ, নি (নাই) খোঁজ যার = নিখোঁজ ইত্যাদি।

৬. অলুক বহুব্রীহি : পূর্বপদের বিভক্তি লোপ না পেয়ে যে বহুব্রীহি সমাস হয়, তাকে অলুক বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন: গায়ে হলুদ দেয়া হয় যে অনুষ্ঠানে = গায়ে হলুদ, মাথায় পাগড়ি যার = মাথায় পাগড়ি, বাকে পটু যে = বাকপটু, কলসি কাঁখে যার = কলসিকাঁখে, মুখে মধু যার = মুখেমধু, পায়ে বেড়ি যার = পায়েবেড়ি, চশমা নাকে যার = চশমানাকে, মাথায় ছাতা যার = মাথায় ছাতা, হাতে খড়ি দেয়া হয় যে অনুষ্ঠানে = হাতেখড়ি, মুখে ভাত দেয়া হয় যে অনুষ্ঠানে = মুখে ভাত ইত্যাদি।

পরীক্ষার জন‌্য ব‌্যাকরণ-এর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ

সকল প্রকার ভর্তি পরীক্ষা, চাকরির পরীক্ষা, HSC পরীক্ষা ও SSC পরীক্ষার জন‌্য বাংলা ব‌্যাকরণ-এর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহের লিংক নিচে দেয়া হলো। হলুদ বাটনে ক্লিক করে বিষয়ভিত্তিক পেজগুলো ভিজিট করুন।

বাগধারা কাকে বলে? অক্ষর দিয়ে বাগধারা পড়তে এখানে ক্লিক করুন। সন্ধি কি? সন্ধি শব্দের অর্থ কি? পড়তে এখানে ক্লিক করুন। এককথায় প্রকাশ বা বাক‌্য সংকোচন পড়তে এখানে ক্লিক করুন কারক কাকে বলে? কারক কত প্রকার? বিভক্তি কি? বিভক্তি কত প্রকার? পড়তে এখানে ক্লিক করুন। সমার্থক শব্দ বা প্রতিশব্দ কি ও এর উদাহরণ পড়তে এখানে ক্লিক করুন। বিপরীত শব্দ পড়তে এখানে ক্লিক করুন লিঙ্গ প্রকরণ এর বিস্তারিত এখানে পড়ুন বানান শুদ্ধিকরণ ও বাক্য শুদ্ধিকরণ এর বিস্তারিত এখানে পড়ুন বচন অর্থ সংখ্যার ধারণা, বিস্তারিত এখানে পড়ুন বিরামচিহ্ন কাকে বলে? বাংলায় বিরামচিহ্ন কয়টি ও কি কি? পড়তে এখানে ক্লিক করুন। প্রমিত বাংলা বানান কী? প্রমিত বাংলা বানানের দশটি নিয়ম লেখ। পড়তে এখানে ক্লিক করুন। জোড় বা সমোচ্চরিত শব্দ- অ থেকে ঔ পর্যন্ত পড়তে এখানে ক্লিক করুন।