নবজাতকের স্বাস্থ্য রক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিমাপ, শিশুর নাভিরজ্জু কাটা

১। শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর কি কি স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত তা আলোচনা কর?
২। নবজাতকের যত্ন সম্পর্কে আলোচনা কর।
৩। নবজাত শিশুর কয়েকটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা তুলে ধর। এই সমস্যার সমাধান কিভাবে করবে?
৪। অপরিণত শিশু কাকে বলে? অপরিণত শিশুর কয়েকটি সমস্যার উল্লেখপূর্বক বর্ণনা কর।
৫। APGAR-স্কোর সম্পর্কে আলোচনা কর। এর গুরুত্ব কি?

নবজাতক সম্পর্কে কিছু কথা

নবজাতকের স্বাস্থ্য রক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিমাপ : শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তার সুস্থতা বজায় রাখা আবশ্যক। প্রসবকালে শিশু অসুস্থ হয়ে পড়লে অথবা প্রসবকাল যদি বিলম্বিত হয়, তাহলে শিশু দূর্বল হয়ে পড়ে এবং পরিবেশের সাথে স্বাধীনভাবে খাপ খাওয়াতে কষ্টসাধ্য হয়। শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর যা যা করণীয় সে সম্পর্কে সবারই জানা উচিত। এগুলো হচ্ছে-

১। শিশুর নাভিরজ্জু কাটা (cutting the umbilical cord) : শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার কিছু পরেই এই কাজটা সম্পন্ন করা উচিত। নাভিরজ্জু হতে রক্তসঞ্চালন কিছু কমে গেলে নাভিরজ্জু কাটা উচিত। যখন এই রজ্জুতে ধুক্ ধুক্ করা কমে আসবে, তখন বুঝতে হবে রক্তসঞ্চালন কমে আসছে এবং শিশুর দেহ তার নিজস্ব শ্বসন ও রক্তসঞ্চালনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। শিশুর নাভীর উপরে, প্রায় তিন আঙ্গুল দূরে, পরিস্কার, জীবাণুমুক্ত ছুরি দিয়ে কাটা উচিত এবং পরিস্কার কাপড় বা ব্যান্ডেজ দিয়ে বেঁধে দিতে হবে। এসব কাজ দ্রুত অভিজ্ঞ ধাত্রী বা নার্স দিয়ে সম্পন্ন করা উচিত। নাভী কাটার পর পরই শিশুর দেহ, চোখ নাক লালচে হয়ে ওঠে ও শিশু টান দিয়ে শ্বাস নিতে আরম্ভ করে। এই সময়ে শিশু কেঁদে ওঠে।

২। শিশুর নাক, কান, মুখ পরিস্কার করা : শিশুকে কয়েক সেকেন্ডে নিচের দিকে মাথা নামিয়ে রাখলে, নাক ও মুখ হতে শ্লেষ্মা বেরিয়ে পড়ে। পরে শিশুকে কোলে রেখে পরিস্কার নরম কাপড় আঙ্গুলে জড়িয়ে মুখের ভেতর পরিস্কার করা উচিত। একই সাথে mucu extrator দিয়ে মুখের ভিতর ও নাকের ভেতর শ্লেষ্মা পরিস্কার করা উচিত। এর পরেও শিশু যদি নিজ থেকে শ্বাস টানতে না পারে, তাহলে জরুরিভাবে শিশুর পরিচর্যা করতে হবে। শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার ৩০-৪০ সেকেন্ডের মধ্যে শ্বাস টানতে না পারলে, তাৎক্ষণিকভাবে শ্বাস নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাস ও দেহে অক্সিজেন সরবরাহ খুবই জরুরি, কারণ অক্সিজেনের অভাবে মস্তিষ্ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থির যথেষ্ট ক্ষতিসাধন হতে পারে। তাই প্রয়োজনে কৃত্তিমভাবে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা নিতে হবে, যখন শিশু নিজ থেকে এ কাজে ব্যর্থ হয়।

৩। শিশুর দেহে তাপমাত্রা বজায় রাখা : শিশুদের দেহ হতে সহজেই তাপ বের হয়, বিশেষ করে স্বল্প ওজন বিশিষ্ট শিশুদের বেলাতে গরম কাপড়ে জড়িয়ে রাখা ভাল। মায়ের গর্ভে উষ্ণ পরিবেশ হতে শিশু হঠাৎ করে ঠাণ্ডা পরিবেশে পড়ে, ফলে তার কাঁপুনি ওঠে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পরিষ্কার নরম কাঁথায় শিশুকে হাল্কাভাবে জড়িয়ে মায়ের কাছে রাখা ভাল। শিশুর হাত পা ঠাণ্ডা থাকলে এবং ফ্যাকাসে দেখালে, গরম রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে।

৪। রোগ-সংক্রমণ হতে রক্ষা : নবজাতকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অপরিণত ও দুর্বল থাকে বলে এদের জন্য বিশেষ সতর্কতার প্রয়োজন হয়। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর শিশুকে মধু, মিছরির পানি, চিনি প্রভৃতি দেওয়ার প্রথা অপ্রয়োজনীয় ও কখনও কখনও ক্ষতিকারকও বটে। তাই শিশু বিশেষজ্ঞরা জন্মাবার পর শিশুকে মায়ের স্তন চুষতে বলেন। এতে করে মায়ের স্তনে হলুদ আঠালো শাল দুধ নিঃসৃত হয় যাতে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধক উপাদান যথেষ্ট পরিমাণে থাকে। অনেকে শাল দুধকে শিশুর প্রথম টিকাও বলে থাকেন।

৫। শিশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা : ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর শিশুর নাভিরজ্জু কাটা হয়। শিশু স্বাভাবিকভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করতে থাকলে নিম্নলিখিত পরীক্ষাগুলো করা উচিত:

(ক) শিশুর জন্ম ওজন : সুস্থ ও full term শিশুর জন্ম ওজন ৩-৪.৫ কেজি হয়। ২.৫ কেজির কম ওজন হলে তাকে স্বল্প-ওজনবিশিষ্ট শিশু (low birth weight) বলা হয়। এসব শিশুদের রোগ সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি থাকে।
(খ) শিশুর জন্মগত ত্রুটি : শিশুর জন্মগত ত্রুটি যেমন বন্ধ মলদ্বার, পিঠে মাংসের পিন্ড, নাক ও ঠোঁট একত্রে থাকা ইত্যাদি পরীক্ষা করা।
(গ) শিশুর দেহে প্রসবকালীন আঘাত : প্রসবকালীন সময় শিশুর দেহে কোন আঘাতের চিহ্ন আছে কি না তা পরীক্ষা করা, যেমন আঘাত পেলে মাথা ফুলে ওঠে, হাত ও পা নাড়াচাড়াতে কোন অসঙ্গতি আছে কি না ইত্যাদি দেখা উচিত।

(ঘ) শিশুর সুস্থতার পরিমাপ : নবজাতকের মধ্যে কয়েকটি মৌলিক সুস্থতার লক্ষণের উপর ভিত্তি করে একটি পরিমাপক ছক তৈরি করেন শিশু বিশিষজ্ঞ Virginia Apgar. এর নাম হচ্ছে Apgar New-born Scoring System. যে বিষয়গুলোর উপর এ মাপ ভিত্তি করা হয়, সেগুলো হচ্ছে শিশুর চেহারা, নাড়ির গতি, সহজাত প্রতিক্রিয়া, সক্রিয়তা ও শ্বাস-প্রশ্বাস। Apgar পরীক্ষা শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার এক মিনিট পর ও পাঁচ মিনিট পর নেয়া হয়। এ পরীক্ষার পরিমাপ এভাবে করা হয়। নাড়ীর গতি যদি প্রতি মিনিটে ১০০-এর নিচে হয়, তাহলে এর মান দাঁড়াবে ১; ১০০-১৪০ হলে মান হবে ২ এবং কোন গতি না পাওয়া গেলে মান হবে শূন্য (০)। একইভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস ক্ষীণ হলে ১, স্বাভাবিক হলে ২ এবং কোন শ্বাস-প্রশ্বাস ১ মিনিটেও না হলে মান হবে শূন্য। মোট মানের পরিমাণ যত বেশি হবে শিশুর স্বাস্থ্যের অবস্থা তত ভালো বলে ধরা হবে। Apgar score ১ মিনিটে ৩ এর কম হলে, ওই শিশুর স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া আবশ্যক। নিচে Apgar score-এর নমুনা দেওয়া হলোঃ

লক্ষণ স্কোর
হৃদস্পন্দনের গতি অতি ক্ষীণ ১০০-এর নিচে ১০০-এর উপরে
শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি নাই ধীর, অনিয়ন্ত্রিত ভাল, শিশু কাঁদে
পেশীর টান (muscle tone) দুর্বল পায়ে ও হাতে টান আছে হাত পায়ের সক্রিয় সঞ্চালন
সহজাত প্রতিবর্তী ক্রিয়া (reflex) কোন প্রতিক্রিয়া নাই সামান্য প্রতিক্রিয়া সক্রিয় প্রতিক্রিয়া ও কান্না
গায়ের রঙ(Skin paller) ফ্যাকাসে নীলাভ রক্তাভ
সব জায়গায় Apgar score নেয়া সম্ভব হয় না। সে ক্ষেত্রে শিশুর সার্বিক চেহারা, শ্বাস-প্রশ্বাস, কান্নাকাটি করা, হাত-পা ছোড়া ইত্যাদি লক্ষণ হতে শিশুর সুস্থতা যাচাই করা যায়।

অপরিণত শিশু

অপরিণত শিশুকে দুভাবে আখ্যায়িত করা যায়-
(১) যে সকল শিশু ৩০ সপ্তাহের কম সময়ে ভূমিষ্ঠ হয়।
(২) যে সকল শিশুর জন্ম ওজন ২.৫ কেজির কম হয়। এদেরকে স্বল্প-ওজনবিশিষ্ট শিশুও বলা হয়।
কি কারণে শিশুরা আগে ভূমিষ্ঠ হয় তা আজও সুস্পষ্ট হয় নি। তবে মায়ের গ্রন্থির কার্যকারিতা, হরমোন ক্ষরণ, ক্লান্তি, ক্লেশ, অতি শ্রম পূর্ণ মেয়াদের আগে ভূমিষ্ঠ হতে পারে। অপরিণত শিশুদের অবশ্যই কিছু না কিছু সমস্যা থাকে এবং পরিবেশের সাথে এদের খাপ খাওয়াতে বেশ বেগ পেতে হয়।

শতকরা ৮-১০ ভাগ শিশু অপরিণত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে। এদের ওজন ২-২.৫ কেজির মধ্যে হয় তবে পরবর্তীকালে এরা যদিও স্বাভাবিক শিশুদের মত বাড়তে থাকে তবুও ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর প্রায় বছর খানেক এদের প্রতি একটু বেশি খেয়াল করা ও যত্নের প্রয়োজন হয়। অপরিণত শিশুর কয়েকটি সমস্যা নিচের ছকে দেওয়া হলোঃ

তাৎক্ষণিক সমস্যা পরবর্তী সমস্যা
অক্সিজেনর অভাব (hypoxia) মানসিক প্রতিবন্ধকতা, খিচুঁনী, লেখাপড়ায় পিছিয়ে পড়া।
স্নায়ুবিক আঘাত কানে বা চোখে সমস্যা, চোখে ছানি।
শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা ফুসফুসে সমস্যা, হাঁপানি।
যকৃতের সমস্যা জন্ডিস, হজমে ব্যাঘাত, অপুষ্টি।
অন্যান্য রোগ সংক্রমণ।

বেশির ভাগ অপরিণত শিশু উপযুক্ত যত্নের মাধ্যমে স্বাভাবিক শিশুদের পর্যায়ে পৌঁছায়। মস্তিষ্কে কোন আঘাত বা ক্ষতি না হলে, অপরিণত শিশুরা তাড়াতাড়ি ওজনে বাড়ে এবং স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

অপরিণত শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে, তাই লোকজনের ভিড়, বদ্ধ পরিবেশ এবং সংক্রামক ব্যক্তি হতে এদের দূরে রাখা উচিত। যে কোন রোগ সংক্রমণ এদের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। খাদ্য হিসেবে মায়ের দুধ উৎকৃষ্ট এবং বিকল্প দুধের ব্যবস্থা শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শে করা উচিত।

ভূমিষ্ঠ হওয়ার ৭২ ঘন্টা অতিক্রম করার পর এদের জীবনের প্রথম সংকটের তীব্রতা কিছুটা কমে। ৩ মাস বয়স হতে এদের দেহে সঞ্চিত লৌহের পরিমাণ কমে আসে, শিশু রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত হয়। লৌহের ও ভিটামিনের সিরাপ দেওয়ার জন্য অনেক চিকিৎসক বলে থাকেন। শিশুকে অবহেলা না করে, বরং মায়ের সান্নিধ্য, আদর, স্নেহ প্রভৃতি শিশুকে উদ্দীপ্ত করে এবং সে দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

শিশুর পরবর্তী বিকাশে অপরিণতির প্রভাব

অপরিণত শিশুর জন্মের প্রথম ৫/৬ মাস তার দৈহিক বর্ধন, পরবর্তী ক্রিয়া প্রভৃতি স্বাভাবিক শিশুর চেয়ে মন্থর (slow) হয়। এরপর উপযুক্ত যত্ন ও পরিচর্যায় শিশুর বর্ধনের গতি স্বাভাবিক হয়ে আসে এবং ২-৩ বছর পর এদের পার্থক্য থাকেই না। তবে শিশু মনোবিজ্ঞানীরা গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন যে কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য অপরিণত শিশুদের বেলাতে প্রকাশ পায়। নিচে এদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হলঃ

১। স্বাস্থ্য ও দৈহিক বর্ধন : অপরিণত শিশুর বর্ধনের গতি মন্থর হয়। প্রথম বছরে তাদের রোগ সংক্রমণ বেশি হয়, বিশেষ করে শ্বাসজনিত এবং নাকের ও গলার। বড় হওয়ার সময় অনেকের মধ্যে অপুষ্টির লক্ষণ দেখা যায়। এদের উচ্চতা ও ওজনও কম হয়। জন্মের সময় অপরিণত শিশুর অক্সিজেনের অভাব হলে দৈহিক ও মানসিক বর্ধনে যথেষ্ঠ ক্ষতিসাধন হয়।

২। অঙ্গ সঞ্চালন : অপরিণত শিশুরা অঙ্গ সঞ্চালনে (motor control) পিছিয়ে থাকে। এদের হাঁটা, চলা অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং দৈহিক কাঠামো দুর্বল হওয়ায় অনেকে দেরিতে বসতে বা হাঁটতে শেখে।

৩। ভাষার বিকাশ : এসব শিশুদের ভাষার ভান্ডার (vocabulary) কম থাকে। ভাষাগত ত্রুটি যেমন তোতলানো, ত্রুটিপূর্ণ উচ্চারণ, ছেলেমি কথা ইত্যাদি বেশি থাকে। কারও মধ্যে পরিণত বয়সেও ভাষার বিকাশ পূর্ণতা লাভ হয় না।

৪। স্নায়ুবিক বিকাশ : শব্দ ও আওয়াজে অপরিণত শিশুরা বেশি সংবেদনশীল হয়। বড় হওয়ার সাথে আওয়াজ, শব্দে এরা মনোযোগ হারায় এবং অস্বস্তিবোধ করে। এছাড়াও দেখা গেছে অপরিণত শিশুরা রঙ এবং চলন্ত বস্তুর প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়।

৫। মানসিক আচরণ : অপরিণত শিশুরা লাজুক ও নরম স্বভাবের হয়। আঙ্গুল চোয়া, নখ কামড়ানো, মেজাজী প্রভৃতি মানসিক সমস্যা এদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। ঘন ঘন কাঁন্নাকাটি করাও এদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়।

৬। সামাজিক আচরণ : অতি শৈশবকালে অপরিণত শিশুরা লাজুক প্রকৃতির হওয়ায় বাবা-মার কাছাকাছি থাকে এবং অনেকটা বাধ্যও হয় বটে। তবে বয়স বাড়ার সাথে মেজাজ মর্জির প্রদর্শন, অসামাজিক আচরণ, সহজে মিশতে না পারা, খাওয়া-দাওয়া নিয়ে সমস্যা প্রভৃতি দেখা যায়। মস্তিষ্কের ক্ষতি হলে শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত অস্তিরতা, স্নায়ুবিক বিকলতা প্রভৃতি আচরণও দেখা দেয়।

নবজাতক শিশুর পরিচর্যা

পারিপার্শ্বিক ও অনুকূল পরিবেশ সম্পর্কে শিশুরা ছোট থাকতেই খুব সজাগ ও অনুভূতিশীল হয় এবং এর ব্যতিক্রম হলে তাদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়- তাই শিশুর উপযুক্ত পরিচর্যার যথেষ্ট প্রয়োজন আছে। শিশু মৃত্যুর হার পৃথিবীর উন্নত দেশের তুলনায় আমাদের দেশে একটু বেশি। শিশু পালন বিষয়ে অজ্ঞতা ও দায়িত্ব জ্ঞানের অভাব ও সামাজিক কুসংস্কার এ পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ভাবী মা ও শিশু পালনে যারা আগ্রহী তাদের শিশু পালনে কিছু জানাবার জন্য এ পরিচ্ছেদের অবতারণা।

শিশু পরিচর্যা করতে যেয়ে শিশুর কতকগুলো মৌলিক চাহিদা সম্পর্কে জানতে হবে- যেমন উপযুক্ত খাদ্য, ঘুম, মলমূত্র ত্যাগ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, আদর-স্নেহ ইত্যাদি। শিশুর এ চাহিদা পূরণের জন্য শিশু পরিচর্যার এমন একটা নিয়ম তালিকা মেনে চলা ভাল যা মার পক্ষে কষ্টসাধ্য ও শ্রান্তিকর না হয় এবং শিশুর জন্য সে রুটিন আরামপ্রদ ও নিরাপত্তামূলক হয়।

১। শিশুর গোসল ও ত্বকের যত্ন : ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরেই শিশুকে হালকা উষ্ণ পানিতে গোসল দিতে হবে এবং নাভি না শুকানো পর্যন্ত আর গোসলের প্রয়োজন নেই। এ কয়দিন জলপাই তেল বা বেবি অয়েল দিয়ে ত্বক পরিষ্কার করা যায়। শিশুর চামড়া খুবই নরম এবং অনুভূতিশীল। তাই অযথা ডলাডলি করা উচিত নয়। গা মোছার জন্যে নরম সুতী কাপড় এবং কোমল সাবান ব্যবহার করা উচিত। গোসলের জন্য প্লাস্টিক বা এনামেলের গামলার নিচে একটা কাপড় বা কাঁথা বিছিয়ে দিলে শিশুর পিছলার ভয় পায় না। শিশুকে দৃঢ়ভাবে ধরে আস্তে আস্তে করে পানিতে নামিয়ে বগল, বুক, পিঠ, পাছা ও পা ধুয়ে দেয়া যায়। তারপর শুকনো কাপড় জড়িয়ে কোলে রেখে ভিজা কাপড় দিয়ে মাথা মুছিয়ে দেয়া যায়। শিশুর কানে যাতে পানি না ঢোকে তার প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। গোসল দেয়ার পূর্বে গোসলের সব সরঞ্জাম, যেমন-শুকনা তোয়ালে, সাবান, জামা-কাপড় যেন কাছে থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে এবং শিশুকে কোন অবস্থাতেই গামলায় একলা রাখা উচিত নয়। শিশুর পানি যদি গরম কিংবা বেশ ঠাণ্ডা হয়, গোসলের সময় শিশুর চোখে বা কানে যদি পানি প্রবেশ করে, কিংবা শিশু যদি গামলায় পিছলিয়ে যায়, তাহলে শিশু গোসলে ভীত হয়ে পড়বে এবং কান্নাকাটি জুড়ে দেবে। পানির তাপমাত্রা আরামদায়ক কি-না, কনুই ডুবিয়ে তা পরীক্ষা করে নেয়া ভাল।

শিশুর প্রসাব-পায়খানার পরে ভেজা ন্যাপকিনে রাখা ভাল না, এতে পাছায় চুলকানি হতে পারে। প্রত্যেকবার প্রসাব-পায়খানার পর পাছা কুসুম গরম পানিতে ধুইয়ে আস্তে আস্তে মুছে গরমের পাউডার এবং শীতের সময় তেল লাগানো যায়। চামড়ার প্রদাহ বা ঘা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত। কারণ চামড়ার ফাটল দিয়ে জীবাণু দেহে প্রবেশ করে অসুস্থতা বাড়াতে পারে।

২। শিশুর ঘুম : আরামের ব্যাঘাত না হলে এবং ক্ষুধা না লাগলে সদ্যপ্রসূত শিশু দিনে-রাতে প্রায় ২০ ঘন্টাই ঘুমায়। অতি ছোটবেলা থেকেই শিশুর ঘুমের অভ্যাস সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত করা ভাল। শিশু যাতে অবাধে সারা রাত ঘুমাতে পারে তার ব্যবস্থা করা দরকার। অতিরিক্ত ক্ষুধা না লাগলে রাতে শিশুকে ঘুম থেকে না তোলাই ভাল।

হজমের ব্যাঘাত বা পেটে গ্যাস সৃষ্টি হলে শিশু ঘুমের ভেতর মোচড়ায় এবং কাঁদে। বিদেশে নাভী শুকানোর পর শিশুকে উপুড় করে, মাথা এক পাশ করে শোয়ানোর প্রচলন আছে। এতে পেটের গ্যাস বেরিয়ে যায় এবং যেসব শিশুর কলিকের সম্ভাবনা থাকে তাদের জন্য পেটের ওপর এ চাপ আরামদায়ক হয়। শিশু ভালভাবে ঘুমিয়ে পড়লে তাকে সাবধানে পাশ ফিরিয়ে শোয়ানো যায়। শিশুর মাথার নিচে অযথা বালিশ, কাঁথা দিলে মাথা চেপ্টা হয়ে পড়ে।

শিশুকে খাবারের পর পরই ঘুমিয়ে পড়বার অভ্যাস করানো ভাল। ঘুমাবার আগে শিশুকে নিয়ে বেশি নাড়াচাড়া বা উত্তেজিত করলে শিশু সহজে ঘুমিয়ে পড়তে পারে না। পরিবেশ শান্তিকর হলে শিশুর ঘুমের ব্যাঘাত হয় না। খুব নরম বিছানা শিশুর শিরদাঁড়ার জন্য ভাল না। তাই মাঝামাঝি ধরনের শক্ত তোষকের উপর চাদর বিছিয়ে তার উপর প্লাস্টিক বিছিয়ে পুনরায় কাঁথা বা চাদর টেনে দেয়া যায়। ঘুমানোর সময় শিশুর গায়ে অযথা কাঁথা বা কম্বল চাপানো দরকার নেই, এতে শিশু অস্বস্তিবোধ করে এবং হাত ও পা ছুঁড়ে গায়ের চাদর ফেলে দেয়। নাকে সর্দি বা কাশি, কানে ব্যথা, হজমের গণ্ডগোল প্রভৃতিতে শিশুর ঘুমের ব্যাঘাত হয়-তাই এগুলোর সময়মত চিকিৎসা করানো উচিত।

৩। শিশুর পোশাক-পরিচ্ছদ : শিশুর জন্য নরম সুতী বস্ত্র সবচাইতে ভাল। শিশুকে অতিরিক্ত কাপড়-চোপড় পরালে তার পরিবহণ ক্ষমতা কমে যায়, ফলে শিশু অস্বস্তিবোধ করে। শিশুর কাপড়-চোপড় নিয়মিত ধুয়ে পরিষ্কার রাখা উচিত। বাচ্চাদের বিব, ন্যাপকিন ও কাঁথা নিয়মিত ফুটানো উচিত (অথবা গরম পানিতে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখা যায়) এবং খেয়াল রাখতে হবে যেন সাবানের অংশ লেগে না থাকে। শিশুকে কোলে নেয়া বা দুধ দেওয়ার সময় নিজের কাপড়ের পরিচ্ছন্নতার দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। খুব ছোট শিশুর কাঁধে বোতাম বা ফিতার ব্যবস্থা থাকা ভাল, পিঠে বোতাম বা হুক থাকলে চামড়ায় দাগ পড়তে পারে। হালকা ডিজাইনের ঢিলে-ঢালা সুতী জামা শিশুর জন্য স্বাস্থ্যকর ও আরামপ্রদ।

৪। মুক্ত আলো-বাতাস : জীবন ধারণের জন্য মুক্ত আলো-বাতাসের প্রয়োজন আছে। শিশুর কক্ষ যেন আলো-বাতাসপূর্ণ হয়। শিশুর শ্বাস চলাচলে যাতে বিঘ্ন না হয় তার জন্য শিশুকে অত্যধিক কাঁথা, কম্বল দিয়ে আবৃত করে রাখা উচিত নয়। এতে দেহের তাপ বৃদ্ধি পায় এবং শিশু অস্বস্তিবোধ করে। একই কারণে শীতের দিনে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রাখলে দেহের তাপ বৃদ্ধি পায়। ঘরের ভেতর শীতের দিনে বাতাসের আর্দ্রতা কমে গেলে অনেক ছোট শিশুর নাক শুকিয়ে যায় এবং শ্বাস টানতে অসুবিধা হয়। এ অবস্থায় বিছানা হতে দূরের জানালা খোলা রাখা ভাল। শিশুকে প্রত্যহ কিছুক্ষণের জন্য মুক্ত আলো-বাতাসে রাখা ভাল। সূর্যের আলো জীবণনাশক। তবে একেবারে ছোট শিশুকে সরাসরি সূর্যের আলোতে না রেখে পাতলা চাদরের ছায়ায় রাখলে শিশুর সূর্যদাহ বা sunburn হওয়ার বিপদ কম থাকে।

৫। শিশুর মল-মূত্র ত্যাগ : সদ্যপ্রসূত শিশুর মল অনেকটা বাদামি বর্ণের হয়, একে meconium বলে। নবজাত শিশুর পায়খানা তরল, আঠালো এবং ঘন হয়। সাধারণত খাওয়ার পর পরই অন্ত্রনালীতে চাপ পড়ে, ফলে শিশু মলত্যাগ করে। বুকের দুধ পান করা শিশুর মল তরল, হাল্কা হলুদ বর্ণের হয়, তবে অন্য দুধ খাওয়া শিশুর মল একটু কঠিন হয়। মলের রঙ এবং গন্ধের পরিবর্তন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া ভাল। সব ছোট শিশুরাই ঘন ঘন প্রস্রাব করে এবং তার পরেই কাঁদে, তাই তাদের কাঁথা বা ন্যাপকিন বার বার বদল করার প্রয়োজন হয়।

৬। শিশুর খাদ্য : শিশুর জন্য মায়ের দুধ সর্বোৎকৃষ্ট খাদ্য-এটাই প্রকৃতির নিয়ম। মায়ের দুধ নানা কারণে উত্তম খাদ্য- এতে রোগ-জীবাণু প্রবেশের ভয় থাকে না, এর উত্তাপ শরীরের তাপমাত্রা অনুযায়ী বলে মায়ের দুধকে গরম বা ঠাণ্ডা করতে হয় না। শিশুর বৃদ্ধির জন্য (কমপক্ষে ছয় মাস পর্যন্ত) যে সব উপাদান যতটুকু পরিমাণে প্রয়োজন মায়ের দুধে তার সবটুকুই আছে। এছাড়াও মায়ের দুধপানে শিশু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পেয়ে থাকে- এলার্জিজনিত রোগ এবং পেটের অসুখ ইত্যাদি মায়ের দুধ খেলে কম হয়। দুধ নিঃসরণের পূর্বে মায়ের স্তন হতে এক প্রকার তরল পদার্থ নির্গত হয়, যাকে colostrum বলে। এতে অধিক পরিমাণে প্রোটিন এবং স্বল্প শর্করা ও স্নেহ পদার্থ থাকে। Colostrum শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ত্বরান্বিত করে শিশুকে সুস্থ রাখে।

শিশুকে বুকের দুধ ‍দিতে হলে ধৈর্য ও মানসিক প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে। মানসিক অশান্তি, অপুষ্টি ও রোগাক্রান্ত অবস্থায় বা উত্তেজিত পরিস্থিতিতে শিশুকে দুধ দেয়া উচিত নয়- এতে যেমন মায়ের দুধের পরিমাণ কমে যাবে তেমনি শিশুর মধ্যে অতৃপ্তি আসবে। শিশুকে বুকের দুধ খাইয়ে মানুষ করা হবে, মায়ের মধ্যে এ আত্নবিশ্বাস থাকা চাই। বুুকের দুধ খাওয়ানোর সময় মায়ের নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি যথেষ্ট যত্নবান হতে হবে-বিশেষ করে পুষ্টিগত দিক দিয়ে। স্তনদানকারী মায়ের খাদ্য চাহিদা গর্ভাবস্থা হতে বৃদ্ধি পায়। পুষ্টিবিদদের মতে দৈনিক ৮৫০ মিলিলিটার দুধ উৎপাদনের জন্য অতিরিক্ত ১০০০ ক্যালরি বা শক্তির প্রয়োজন হয়। এই বাড়তি চাহিদা মায়ের স্বাভাবিক খাদ্য যেমন ভাত, ডাল, রুটি, মাছ, মাংস, দুধ, ‍ডিম, শাক-সব্‌জি ও ফলের পরিমাণ বাড়িয়ে মেটাতে পারেন।

বুকের দুধ পান করাবার একটা তালিকা বা রুটিন মেনে চলা ভাল। এতে শিশু নিয়মমাফিক দুধ পাবে বলে তার হজম ক্রিয়া স্বাভাবিক থাকবে এবং আগের থেকে রুটিন জানা থাকাও শিশুর মা'ও মানসিক দিক দিয়ে দুধ দেবার জন্য প্রস্তুত খাকবে। মায়ের দুধও চাহিদা অনুযায়ী পরিমিত পরিমাণে নিঃসরিত হবে। দুধ দেবার সময়ে মায়ের আসনের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। একটি আরামদায়ক হেলানো চেয়ার বা দেয়ালে বালিশে ঠেস দিয়ে শিশুকে কোলে নিয়ে দুধ দেয়া যায়। রাত্রিবেলা শোয়া অবস্থায়ও দুধ দেয়া যেতে পারে, তবে খেয়াল রাখতে হবে স্তনের ভার যেন শিশুর নাকের উপর না পড়ে।

দুধ দেয়ার সময় একেক শিশুর প্রতিক্রিয়া একেক রকমের হয়। ডাঃ বেন্‌জামিন অনেক গবেষণা করে লক্ষ্য করেছেন যে, দুধ খাওয়ার ভিতর দিয়ে শিশুর ব্যক্তিত্ব করা সম্ভব হয়। যেমন অতি আগ্রহী শিশু স্তনের বোঁটার ছোঁয়া পেলেই সজোরে চুষতে আরম্ভ করে। উত্তেজিত শিশু খাওয়ার এতই ব্যস্ত হয় যে, বার বার স্তনের বোঁটা হারিয়ে ফেলে চিৎকার জুড়ে দেয়।

আবার কিছু কিছু শিশুকে দুধের বোঁটা মুখে ছোয়ানোর পর তবেই হাঁ করে। যদি কোন শিশু প্রথমাবস্থায় বুকের দুধ খেতে আগ্রহ না দেখায় তবে তাকে দুধ খাওয়ানোর জন্য জোর করা উচিত নয়- ক্ষিদে পেলে সে আপনা থেকেই খাবে।

নবজাতক শিশুকে ৩/৪ ঘন্টা অন্তর দুধ দেয়া যেতে পারে। মায়ের দুধের সরবরাহ ঠিক রাখার জন্য উভয় স্তনই ব্যবহার করা ভাল। শিশুর পেট ভরল কি-না, তা মায়ের চাইতে শিশুই ভাল বুঝতে পারবে। ১৫-২০ মিনিট দুধ খাওয়ানোর পর যদি শিশু ঘুমিয়ে পড়ে তাহলে বুঝতে হবে যে তার ক্ষুধা নিবৃত হয়েছে। কিন্তু যদি শিশু ৫-১০ মিনিট দুধ টেনে ঘুমিয়ে পড়ে এবং ঘন্টাখানেকের মধ্যে কান্নাকাটি জুড়ে দেয় তাহলে বুঝতে হবে যে তার পেট ভরেনি নয়তো অন্য কোন অসুবিধা আছে।

কোন কারণে যদি শিশু মায়ের দুধ না পায় তাহলে গরু বা ছাগলের দুধ অন্যথায় টিনের দুুধের আশ্রয় নিতে হবে। ছাগলের দুধে সম-পরিমাণ পানি, ১ চামচ চিনি মিশিয়ে ফুটাতে হবে এবং ঠাণ্ডা করে চামচে বা বোতলে খাওয়ানো যেতে পারে। দুধ তৈরির সরঞ্জাম, যেমন- সস্‌প্যান, চামচ, বাটি ইত্যাদি ফুটানো পানিতে অবশ্যই ধুয়ে নিতে হবে এবং ধোয়ার পর ঢেকে রাখতে হবে। দুধের বোতল, নিপল পানিতে ফুটিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে এবং খাওয়ার পর গরম পানিতে ধুয়ে ঢেকে রাখতে হবে। কোন ক্রমেই বোতলের বা বাটির অবশিষ্ট দুধ পুনরায় শিশুকে খেতে দেয়া উচিত নয়। শিশুকে কোলে নিয়ে দুধ খাওয়ালে মা ও শিশু উভয়ের মধ্যে বন্ধন দৃঢ় হবে। মায়ের দুধ বা অন্য দুধ খাওয়ানোর চেয়ে মায়ের স্নেহ মমতাই হচ্ছে সবচাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

নবজাতক শিশুর কয়েকটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা

নবজাতক শিশু ও খুব ছোট শিশুদের নানারকম দৈহিক সমস্যা দেখা দেয়, তবে কতকগুলো সমস্যা সাধারণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ বা বিনা ওষুধে মোকাবেলা করা যায়, তাই এ সর্ম্পকে কিছু তথ্য নিচে দেয়া হলঃ

(ক) শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাস : অনেক শিশুর শ্বানালীতে ও নাকে অতিরিক্ত শ্লেষ্মা জমে থাকে, ফলে শিশু স্বাভাবিকভাবে শ্বাস টানতে পারে না এবং দুধ চুষতেও তার কষ্ট হয়। এ অবস্থায় শিশুর পা ধরে ঝুলিয়ে তার পিঠে হাল্কাভাবে চাপড় দিলে নাক মুখ দিয়ে শ্লেষ্মা বেরিয়ে পড়বে। অবশ্য ভরা পেটে এ রকম করলে শিশু বমি করে ফেলবে। দিনে বেশ কয়েকবার এরকম ভাবে জমে থাকা শ্লেষ্মা বের করার প্রয়োজন হতে পারে, কারণ শ্লেষ্মা ও সর্দি জমে থাকলে শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাসে শিশুর বুকের ছাতি ঘন ঘন ওঠানামা করে, ফলে শিশু অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় শিশুকে প্রচুর পানি খাওয়ানো উচিত। এর সাথে মলদ্বারে তাপমাত্রা যদি ১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইট-এর উপরে হয়, তাহলে শিশু অসুস্থ এবং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

(খ) Regurgitation বা উগ্‌রানো : প্রায়ই ছোট শিশুদের দুধ উগ্‌রিয়ে তুলতে দেখা যায়, তবে ৩/৪ মাস বয়সের পর উগ্‌রানোর মাত্রা কমে আসা উচিত। খুব ছোট শিশুদের পাকস্থলী ও অস্ত্রের পেশী মজবুত না থাকাতে তরল খাদ্য অতি সহজেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে, বিশেষ করে খাওয়ানোর পর পরই শিশুকে চিত করে শোয়ালে বা কোলে নিয়ে ঝাঁকাঝাঁকি করলে এরূপ উগ্‌রানো বেশি দেখা যায়। তাই খাওয়ানোর পর শিশুকে কিছুক্ষণ কোলে বসিয়ে রাখলে এবং বোতলে খাওয়ালে কয়েকবার খাওয়া বন্ধ করে শিশুর পিঠ চাপড়িয়ে বাতাস বের করালে ফল হয়। ৪/৫ মাস বয়সেও শিশু যদি খাবার উগ্‌রিয়ে তোলে তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন।

(গ) Colic বা ফিক্‌ ব্যথা : শিশুর পেটে ফিক্‌ ব্যাথা হলে শিশু হাত-পা শক্ত করে একনাগাড়ে চিৎকার করে। এর সাথে পেট ফাঁপতে পারে এবং শিশুর মলদ্বার হতে গ্যাস বের হতে পারে। এর কারণ বহু রকমের হতে পারে-বদহজম, অতিরিক্ত বাতাস, খাদ্যে অসহিষ্ণুতা বা allergy, অন্ত্রের reflex, কোষ্ঠকাঠিন্য, অত্যধিক গরম এবং উত্তেজনা উল্লেখযোগ্য। শিশুর কৃত্রিম খাদ্য সহজপাচ্য হওয়া উচিত এবং শ্রান্তিকর পরিবেশে খাওয়ানো উচিত। Colic-ভুক্ত শিশুদের উপুড় করে শোয়ালে তারা আরামবোধ করে। শিশুকে বুকে নিবিড় করে ধরে রাখলেও অনেক উত্তেজিত শিশু শান্তি বোধ করে। তবে এ ধরনের সমস্যা ৪/৫ মাস বয়সের পর কমতে থাকে।

(ঘ) শিশুর ন্যাবা বা জন্‌ডিস : শতকরা ৫০ ভাগ নবজাতকের ৩-৬ দিনের ভেতর ন্যাবা বা জন্‌ডিস হতে দেখা যায়। শিশুর চোখের ভেতর সাদা অংশ ও চামড়া হলদে বর্ণ হয়। এটা সাময়িক সমস্যা এবং গর্ভাবস্থায় স্বল্প অক্সিজেনের সরবরাহের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্টি হয়। নবজাতকের দেহে যে অতিরিক্ত অপরিণত রক্তকণিকা তৈরি হয়, তা জন্মাবার পর পর্যাপ্ত অক্সিজেনের সরবরাহে ভেঙ্গে globin এবং heme-তে রূপান্তরিত হয়। Heme বিশ্লেষিত হয়ে লৌহ ও bilirubin-এ পরিণত হয় এবং স্বাভাবিক অবস্থায় যকৃতের একজাতীয় অনুঘটক এই bilirubin-কে দ্রবণীয় করে প্রস্রাবের মধ্য দিয়ে দেহ হতে নির্গত করতে সাহায্য করে। অনেক নবজাতকের যকৃতে এই অনুঘটকের অভাব থাকে, ফলে এই হলুদ বর্ণের bilirubin অদ্রবণীয় থাকে এবং রক্তে মিশে চামড়া ও চোখ হলুদ বর্ণ করে। এই ন্যাবা ৭-১৪ দিনের ভেতর মিলিয়ে যায়। তবে শিশু জন্মের ৩৬ ঘন্টার মধ্যে যদি এই ন্যাবা দেখা দেয়, তাহলে তা শিশুর পক্ষে ক্ষতিকর। সাধারণত এসব শিশুদেরকে উজ্জ্বল আলোর নিচে রাখা হয়। আলোর প্রভাবে bilirubin বিশোধিত হয়ে বৃক্কের মাধ্যমে দেহ হতে নিষ্কাশিত হয়। অতিরিক্ত bilirubin মস্তিষ্কের ক্ষতিসাধন করতে দেখা গেছে, তাই চিকিৎসকের উপদেশ নেয় উচিত।

(ঙ) রক্ত জমাটকরণের অক্ষমতা : নবজতকের মধ্যে আরেক ধরনের যে অসুবিধাটা দেখা যায়, সেটা হচ্ছে রক্ত জমাটকরণের অক্ষমতা। যকৃতের অপরিণতির জন্য রক্ত জমাটকরণের উপাদান ঠিকমত উৎপাদিত হয় না এবং অন্ত্রে জীবাণু দ্বারা উৎপন্ন ভিটামিন “K” ও প্রথমে কয়েকদিন তৈরি হতে পারে না, ফলে শিশুর কোথাও রক্তক্ষরণ হলে তা সহজে থামে না। তাই প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে অনেক চিকিৎসালয়ে নবজতকের দেহে ভিটামিন K ইনজেকশন দেওয়া হয়।

নবজাতকের আগমনে পরিবারে যে আনন্দ, আলোড়নের সৃষ্টি হয়, তাতে করে পারিবারিক জীবনধারার কিছুটা পরিবর্তন আসে এবং অনেক কিছুর রদবদল করতে হয়। মাকে তার দৈনিক কাজ-কর্মের রুটিনের অবশ্যই কিছুটা পরিবর্তন আনতে হবে যাতে নবজাতক শিশুর পরিচর্যা ও নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন তার দৈনিক কাজে প্রাধান্য পায়। শিশু যাতে সময়মত দুধ পান করতে পারে, ঘুমাতে পারে ও মায়ের সান্নিধ্য, যত্ন, আদর-স্নেহ পায়, তার প্রতি অবশ্যই নজর দিতে হবে। শিশুর পরিচর্যা করা ছাড়াও মা শিশুর উচ্চারিত ধ্বনি, হাসি-কান্না ইত্যাদি বুঝতে চেষ্টা করবেন, যাতে মা ও শিশুর মধ্যে একটা নিবিড় বন্ধনের সৃষ্টি হয়।

গর্ভবতী মায়ের যত্ন

১। গর্ভবতী মায়ের খাদ্য ও পুষ্টি সম্পর্কে আলোচনা কর। মায়ের অপুষ্টিতে সন্তানের কি কি ক্ষতি হতে পারে?
২। গর্ভকালীন সময়ে কয়েকটি পরীক্ষা বর্ণনা কর।
৩। গর্ভকালীন “ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা” ও কি কি কারণে গর্ভাবস্থায় ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়- বুঝিয়ে লিখ।

গর্ভবতী মায়ের যত্ন সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন এখানে

প্রসবকাল, নিরাপদ মাতৃত্ব, প্রসবকালীন বিষয়াদির প্রভাব

১। সন্তানের প্রসবকাল কিভাবে নির্ধারণ করা হয়? প্রসবকালীন স্তর, বৈশিষ্ট্য এবং প্রভাবিত বিষয়াদি সম্পর্কে লিখ।
২। প্রসব কয় প্রকারের হয়? প্রত্যেক প্রকার প্রসবের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে লিখ।
৩। প্রসবকালীন জটিলতার মধ্যে মস্তিস্কের আঘাত কেন সবচেয়ে ক্ষতিকর? কিভাবে ক্ষতি হতে রক্ষা পাওয়া যায়?
৪। নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য কি কি বিষয় জানা আবশ্যক, আলোচনা কর।

প্রসবকাল, নিরাপদ মাতৃত্ব, প্রসবকালীন বিষয়াদির প্রভাব

শিশু জন্মের পর পরিচর্যা সম্পর্কে জানুন

শিশু জন্মের পর তার কি ধরনের পরিচর্যা করতে হয়? এ ব‌্যাপারে আমরা অনেকেই জানিনা। শিশু জন্মের পর তার সঠিক পরিচর্যা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর স্বাস্থ‌্যের যত্ন, শিশুর কাপড় ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, শিশুকে দুধ খাওয়ানোর নিয়ম, শিশুর ঘুমানোর নিয়ম, শিশুর মলত‌্যাগ করার নিয়ম, শিশুর দাঁত পরিষ্কার করা ইত‌্যাদি বিষয়ে সচেতন হতে হবে। তাই সচেতন মা-বাবা হিসেবে প্রত‌্যেক পিতা-মাতার শিশু জন্মের পর পরিচর্যা সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা প্রয়োজন।

শিশু জন্মের পর পরিচর্যা সম্পর্কে জানুন

নবজাতকের খাবার - মায়ের বুকের দুধ

নবজাতকের খাবার - মায়ের বুকের দুধ। নবজাতক শিশুকে তার মায়ের বুকের দুধ কেন খাওয়াবেন? শিশুকে দুধ খাওয়ানোর নিয়ম কি? শিশুকে দুধ খাওয়ানোর প্রয়োজনীয়তা কি? নবজাতকের খাবার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে এখানে।

নবজাতকের খাবার - মায়ের বুকের দুধ

শিশু লালন পালন বিষয়ক উপদেশ

শিশুদের সেবা-যত্ন কিভাবে করতে হয়? শিশুদের শিক্ষা-দীক্ষা কি? শিশুর আদব-কায়দা কি? শিশুর পোষাক পরিচ্ছদ কি? শিশুর ন‌্যাপকিন কিভাবে ব‌্যবহার করবেন? এখানে শিশু লালন পালন বিষয়ক কিছু উপদেশ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। প্রত‌্যেক পিতা-মাতার এ বিষয়গুলো নিয়ে সচেতন ভূমিকা পালন করা উচিত।

শিশু লালন পালন বিষয়ক উপদেশ

অটিজম (Autism) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা

অটিজম শিশুদের অন্যতম বিকাশমূলক বৈকল্য। শিশুদের আচরণের মাধ্যমে এ সমস্যার বহিঃপ্রকাশ হয়। মনোচিকিৎসক লিও কে'কনার এ সমস্যাকে সর্বপ্রথম ১৯৪৩ সালে আলাদা একটি সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করেন এবং অটিজম নামে অভিহিত করেন। Autism শব্দটি গ্রীক Autos শব্দ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। অন্য ব্যাক্তিদের প্রতি এসব শিশুদের আগ্রহের অভাবের অবস্থা বর্ণনা করার জন্য তিনি অটিজম শব্দটি ব্যবহার করেন।

অটিজম (Autism) সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন এখানে

শারীরীক প্রতিবন্ধিতা কি? বিভিন্ন ধরনের শারীরিক প্রতিবন্ধিতা

সীমিত অর্থে শারীরীক প্রতিবন্ধিতা (Physical disability) বিভিন্ন ধরনের সঞ্চালনমূলক প্রতিবন্ধিতা (Motor disability)- এর সমন্বিত অবস্থা। দৈনন্দিন জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সমবয়সীদের মত শারীরীক কর্মকান্ড বিশেষ সাহায্য ব্যতিরেখে করার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা হল শারীরিক প্রতিবন্ধিতা। শারীরিক প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে অন্য কোন ধরনের প্রতিবন্ধিতা যুক্ত থাকতে পারে। শারীরিক প্রতিবন্ধি শিশুদের বুদ্ধি স্বাভাবিক থাকতে পারে, কম থাকতে পারে কিংবা গড়ের বেশিও থাকতে পারে। শারীরিক প্রতিবন্ধিতা জন্মগত বা রোগ বা দুর্ঘটনা দ্বারা অর্জিত হতে পারে এবং তা মৃদু বা গুরুতর হতে হবে। শারীরিক প্রতিবন্ধিতা শিশুর শিক্ষা গ্রহণ ক্ষমতাকে সীমিত করতে পারে। সে কারণে অনেকের বিশেষ শিক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।

শারীরীক প্রতিবন্ধিতা কি? বিভিন্ন ধরনের শারীরিক প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন এখানে

দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা কি? এর শ্রেণিবিভাগ, বিকাশ ও বৈশিষ্ট্য

চেখের গঠন বা কার্যকারিতার ত্রুটির কারণে শিশুর দৃষ্টিক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা (Visual Impairment) বলতে শিশুর দৃষ্টিক্ষমতার সে পরিমাণ ক্ষতিকে বুঝায় যেক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষা উপকরণ অথবা শিক্ষার পরিবেশের পরিবর্তন করা না হলে শিশুর সর্বোচ্চ শিক্ষণ ও সাফল্য অর্জন সম্ভব হয় না (ব্যারাগা ১৯৮৩)।

দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা কি? এর শ্রেণিবিভাগ, বিকাশ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন এখানে

শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা কি? শ্রবণ প্রতিবন্ধিতার শ্রেণিবিভাগ

কান ও শ্রবণ সংবেদন পরিবাহী অঙ্গের কোন প্রকার ক্ষতির জন্য শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা দেখা দেয় এবং শ্রবণ প্রতিবন্ধিতার মাত্রাভেদে কথা শোনা ও কথা বলার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয়। ‘শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা (Hearing Impairment)’ বলতে মৃদু থেকে চরম পর্যন্ত যেকোন মাত্রার শ্রবণ অক্ষমতাকে বুঝায়। এর আওতায় বধির মাত্রার শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা ও আংশিক মাত্রার শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা এ দুই উপ-বিভাগ অন্তর্ভুক্ত (ব্রিল, ম্যকনেইল ও নিউম্যান-১৯৮৬)।

শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা কি? শ্রবণ প্রতিবন্ধিতার শ্রেণিবিভাগ সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন এখানে