আর্ত্তব-ব্যাধি (ঋতু বা মাসিকের রোগ) (Disorder of Menstruation)

ঋতু বা মাসিকের বিভিন্ন ধরনের রোগকে আর্ত্তব-ব্যাধি বা Disorder of Menstruation বলা হয়। এখানে বিভিন্ন প্রকার আর্ত্তব-ব্যাধি (ঋতু বা মাসিকের রোগ) ও এর হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা নিয়ে পর্যায়ক্রমে আলোচনা করা হয়েছে।

আর্ত্তব-ব্যাধি (ঋতু বা মাসিকের রোগ) (Disorder of Menstruation) কত প্রকার?

IMAGENAME

আর্ত্তব-ব্যাধি (Disorder of Menstruation) অথবা ঋতু বা মাসিক সম্বন্ধীয় রোগের মধ্যে নিম্নলিখিত প্রধান পীড়াগুলির বিবরণ পর্যায়ক্রমে বর্ণনা করা হয়েছে।

(ক) প্রথম মাসিকে বা রজঃস্রাবে বিলম্ব, (খ) রজোরোধ, (গ) অনিয়মিত মাসিক বা ঋতু, (ঘ) অনুকল্প রজঃ বা মাসিক, (ঙ) স্বল্প-রজঃ বা অল্প মাসিক, (চ) অতি-রজঃ বা অতিরিক্ত মাসিক, (ছ) বাধক-বেদনা বা ঋতুশূল, (জ) প্রদর ও শ্বেতপ্রদর, (ঝ) রজোনিবৃত্তি, (ঞ) হরিৎরোগ। ঋতু বা মাসিক সম্বন্ধীয় পীড়ায়, ঋতু বা মাসিকের অব্যবহিত পরবর্তী সময়ই ঔষধ সেবনের মুখ্য সময়। স্থান বিশেষে পরবর্তী ঋতু বা মাসিকের পরও ঔষধ প্রয়োগের প্রয়োজন হতে পারে।

প্রায় সব রকম আর্ত্তব-ব্যাধিতেই (ঋতু বা মাসিকের রোগে) পালসসিপিয়া এই দুটি ঔষধ ফলপ্রদ। পালস সাধারণত শান্তপ্রকৃতি, কোমলস্বভাবা, সহজেই ক্রন্দনশীলা নারীদের পক্ষে উপযোগী এবং সিপিয়া সব বিষয়ে এমন কি নিজ প্রিয় পরিজনবর্গের বিষয়েও উদাসীনা রমণীদের পক্ষে উপযোগী।

প্রথম রজঃস্রাব বা মাসিকে বিলম্ব (Delayed Menstruation)

কমপক্ষে ১৪ বৎসর বয়স অতিক্রমের সময় একজন মেয়ে বা কিশোরীর যোনিপথ দিয়ে প্রথম রজঃস্রাব বা মাসিক হয়ে থাকে। কোন কোন মেয়ের রজঃস্রাব বা মাসিকে বিলম্ব বা দেরী হয় অথবা প্রথমে একবার মাত্র স্রাব হয়ে তা বন্ধ হয়ে যায়।

প্রথম মাসিক বা রজঃস্রাবে দেরী বা বিলম্বের প্রধান ও মুখ্য কারণ জরায়ু ও ডিম্বকোষের স্বাভাবিক পুষ্টি বা বৃদ্ধির অভাব। শরীরের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত কয়েকটি গ্রন্থি তাদের আভ্যন্তরিক নিঃসরণ দ্বারা শরীরের পোষণ, বৃদ্ধি ও অন্যান্য বহু জটিল বৃত্তিসমূহের উৎকর্ষ সাধনে সহায়তা করে থাকে। মেয়েদের ডিম্বকোষ হতে দুই প্রকার নিঃসরণ হয়। প্রথমটির সাহায্যে ডিম্বকোষ হতে ডিম্ব বাহির হয়ে কালল-নল সাহায্যে জরায়ুতে আসে- একে বহি নিঃসরণ বলে। অপরটি অন্ত নিঃসরণ- এর সাহায্যে সন্তান উৎপাদন সংক্রান্ত সমস্ত যন্ত্র বৃদ্ধি ও পুুষ্টিলাভ করে থাকে এবং এর অভাব ঘটলেই প্রজনন যন্ত্রসমূহ পুষ্টির অভাব, রজোদর্শন বা মাসিকে বিলম্ব অথবা সম্পূর্ণ রজোরোধ বা মাসিক বন্ধ এবং প্রজনন ক্ষমা লোপ প্রভৃতি উপসর্গ দেখা দেয়। স্নায়বিক দুর্বলতা, দীর্ঘ সময় কোন অসুখে ভুগে শারীরিক দুর্বলতা ও রক্তস্বল্পতা বশত এবং যোনিমুখ-আবরক ঝিল্লী ছিন্ন না হওয়াতে প্রথম রজোদর্শন বা মাসিক এর দেরী বা বিলম্ব হয়।

প্রথম মাসিক বা রজঃস্রাব বিলম্ব বা দেরী হওয়ার লক্ষণ

অনেক মেয়ে বা তার অভিভাবক বুঝতে পারে না যে মেয়েটির প্রথম মাসিক বা রজঃস্রাব বিলম্ব হচ্ছে। এর লক্ষণগুলো জানা থাকলে সহজেই যে কোন মেয়ে বা তার অভিভাবক বুঝতে পারবে যে মেয়েটির প্রতম মাসিকে বিলম্ব হচ্ছে। প্রথম মাসিকে বিলম্ব হওয়ার লক্ষণগুলো নিম্নরূপঃ

মাথা ভার ও ব্যথা, নাক দিয়ে (সময়ে সময়ে মলদ্বার দিয়ে) রক্তস্রাব, বুক ধড়ফড় করা, শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্টবোধ, কোমরে ও উরুদেশে ভারবোধ ও তলপেটে ব্যাথা।

প্রথম মাসিক বা রজঃস্রাব বিলম্ব হওয়ার হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা

পালসেটিলা ৩x, ৩০- এই রোগের প্রধান ঔষধ। উদরে ও পৃষ্ঠে ব্যাথা, মাথাব্যথা, অরুচি, সবসময় শীত বা ঠান্ডা অনুভূতি, অলসতা, বমি করার ইচ্ছা, বুক ধড়ফড় করা, রক্তস্বল্পতা উল্লিখিত লক্ষণসহ শ্বেতপ্রদর থাকলে, সিপিয়া ৬।

সিনিসিও ০- প্রথম মাসিক বা রজঃস্রাবে বিলম্ব, অথবা প্রথম দুই-একবার ঋতু হয়ে ঋতুরোধ, কষ্টকর অল্প পরিমাণ বা অনিয়মিত ঋতু।

সালফার ৩০- এই রোগে ঋৎকৃষ্ট ঔষধ। কোমরে ব্যাথা, মাথা দপদপ করা বা মাথা ঘোড়া, অজীর্ণতা, অর্শসহ কোষ্ঠকাঠিন্য, খিটখিটে মেজাজ বা মৌনভাব।

অ্যাকোনাইট ৩x- একবার রজঃস্রাবের পর হঠাৎ ঠান্ডা লেগে ঋতু বন্ধ হলে অথবা ভয়জনিত ঋতু বন্ধ হলে।

ব্রাইয়োনিয়া ৩, ৩০- যোনিপথে রজঃস্রাবের পরিবর্তে নাক বা মুখ দিয়ে রক্ত নিঃসরণ, শুষ্ক কাশি, বক্ষঃস্থলে সুই বিদ্ধ হওয়ার মত ব্যাথা, কোষ্ঠকাঠিন্য।

ভিরেট্রাম-অ্যাল্ব ৬,৩০- স্নায়বিক মাথাধরা, দুর্বলতাসহ মূর্চ্ছা বা হিষ্টিরিয়া, বমি হওয়া বা বমি করার ইচ্ছা, তরল ভেদ, বিবর্ণ মুখমন্ডল, হাত-পা, নাক প্রভৃতি শীতল লক্ষণে।

নেট্রাম-মিউর ১২x বিচূর্ণ- শীর্ণ ও বিনিদ্র রোগিণী পক্ষে উপযোগী, শীতবোধ, পা ঠান্ডা, কোষ্ঠকাঠিন্য।

সিমিসিফিউগা ৬- ডিম্বকোষের স্নায়ুশক্তির দুর্বলতাবশত রজোলোপ, মাথা ব্যাথা, রক্তশূণ্যতা, বাম অঙ্গে- বিশেষত বাম স্তনে ব্যাথা।

প্রথম মাসিক বা রজঃস্রাব বিলম্ব হলে আরো কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। ঠান্ডা লাগানো যাবে না। ঠান্ডা পানিতে গোসল করা যাবে না। অলসতা বর্জন করতে হবে। গরম মসলা কিংবা উত্তেজক পান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। উষ্ণ পানির টবে কোমর পর্যন্ত ডুবিয়ে রাখলে অথবা পেটে ফ্লানেল বা গরম কাপড় জড়িয়ে রাখলে উপকার পাওয়া যায়।

রজোরোধ বা মাসিক শুরু হয়ে বন্ধ হওয়া (Amenorrhoea)

রক্তস্রাব শুরু হয়ে কখনও কখনও বন্ধ হয়ে যায়। একে রজোরোধ বা Amenorrhoea বলে। মাসিক শুরু হয়ে বন্ধ হওয়া নিয়ে অনেকেই চিন্তিত হয়ে পড়েন। অনেকেই রজোরোধ বা মাসিক শুরু হয়ে বন্ধ হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানেন না। রজোরোধ বা মাসিক শুরু হয়ে বন্ধ হওয়ার কারণ হলো- অলসতা, রক্তসল্পতা, সঙ্গমদোষ, ঠান্ডা লাগান, পানিতে ভেজা, দীর্ঘ পথ পর্যটন, হঠাৎ শোক, ক্রোধ, দুঃখ বা ভয় পাওয়া প্রভৃতি কারণে রজোরোধ বা মাসিক শুরু হয়ে বন্ধ হয়।

রজোরোধ বা মাসিক শুরু হয়ে বন্ধ হওয়ার চিকিৎসা

অনেকেই বলেন, পালসেটিলাফেরাম পর্যায়ক্রমে প্রয়োগ, রজোরোধ বা বিলম্বিত ঋতুর উৎকৃষ্ট ঔষধ। যৌবন এর শুরুতে তরুণীদের রজঃ বা মাসিক প্রকাশ না পেলে- পালস ৩, ৬x এক মাস সময় ধরে অর্থাৎ যতদিন না স্রাব আরম্ভ হয়। মস্তকে রক্তসঞ্চার জনিত মাথাঘোরা, চোখে অন্ধকার দেখো ও চোখের কোটরে এবং গর্ভাশয়ে ও ডিম্বাশয়ে তীব্র ব্যাথা ও প্রলাপ লক্ষ করা হলে- বেলেডোনা ৩। নাক দিয়ে রক্তস্রাব, মাথাঘোরা, বক্ষঃস্থলে ও পার্শ্বে সুই বিদ্ধ হওয়ার মত ব্যাথা, শুষ্ক কাশি এবং পাকস্থলীতে ব্যাথা হলে- ব্রাইয়োনিয়া ৬। তলপেটে তীব্র ব্যাথা (পরিশ্রম করলে বেড়ে যায়), বিমর্ষচিত্ততা ও নির্জন প্রিয়তা লক্ষণ করা গেলে- সিপিয়া ৬। ঠান্ডা লেগে রজোরোধে- অ্যাকোনাইট ৬, এতে উপকার না হলে- পালসেটিলা ৩। নির্দিষ্ট সময়ে (অর্থাৎ ২৮ দিন পর) ‍ঋতু আবির্ভূত না হলে- পালসেটিলা ৩। নির্দিষ্ট সময়ে (অর্থাৎ ২৮ দিন পর) ঋতু আবির্ভূত না হলে- সালফার ৩০। মানসিক ক্লেশজনিত পীড়ায়- ইগ্নেসিয়া ৬। পানি ধরে বা রক্তসল্পতার কারণে রজোরোধ হলে- ক্যাল্কে-কার্ব ৩০ বা নেট্রাম-মিউর ৩০। রক্তস্বল্পতা বা উদরাময় সহ রজোরোধ হলে- ফেরাম ৬। ঋতুবন্ধ হয়ে রোগিণী পেট ব্যাথায় ছটফট করলে- জেলসিয়াম ৬, ক্যামোমিলা ৩, ম্যাগ্নেসিয়া-ফস ২x, ১২x বিচূর্ণ (গরম পানিসহ সেবন করতে হবে) সিমিসিফিউগা ৩x, সাইক্লেমন ৬, আর্স ৬, নেট্রাম-মিউর ৩০, হেলোনিয়াস ১x, বেল ৩, অশোক ০, অ‌্যাব্রোমা ০ প্রভৃতি ঔষধও সময় সময় আবশ‌্যক হতে পারে। রক্তস্বল্পতা বা যক্ষা কাসির কারণে রজোরোধ হলে, তত্ত্বৎ পীড়া দ্রষ্টব‌্য। পীড়া দুরারোগ‌্য হলে- ম‌্যাঙ্গানিজ-ডাই-অক্সাইড ৩x পত‌্যেকদিন এক গ্রেণ করে চারবার সেবনে উপকার হওয়ার সম্ভাবনা আছে। উষ্ণ পানিতে কোমর পর্যন্ত ডুবিয়ে রাখলে, দুধে পানি মিশিয়ে পান করলে, গরম পানিতে ফ্লানের ভিজিয়ে সেঁক দিলে প্রভৃতিতে উপকার পাওয়া যায়।

জরায়ু, ঋতু বা মাসিক, গর্ভসঞ্চার কি?

স্ত্রীরোগ চিকিৎসা শুরু করার আগে স্ত্রী-জননেন্দ্রিয় সম্বন্ধে জানতে হবে। জরায়ু (uterus), ঋতু বা মাসিক (menstrution), গর্ভসঞ্চার কি? এ বিষয়ে ধারণা থাকতে হবে। স্ত্রী-জননেন্দ্রিয় এবং বিভিন্ন স্ত্রীরোগ এর নাম ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত পড়তে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।

জরায়ু, ঋতু বা মাসিক, গর্ভসঞ্চার বিস্তারিত এখানে

অনিয়মিত ঋতু (Irregular Menstruation)

অনিয়মিত ঋতু বা অনিয়মিত মাসিক মেয়েদের জন‌্য কষ্টদায়ক এবং অস্বস্থির কারণ। অনিয়মিত ঋতু বা Irregular Menstruation সম্পর্কে মেয়েদের সঠিক ধারণা না থাকার কারণে তারা বিভ্রান্তিতে ভোগে। অনিয়মিত ঋতু বা Irregular Menstruation এর লক্ষণ ও এর হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত পড়তে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।

অনিয়মিত মাসিক ও এর চিকিৎসা বিস্তারিত এখানে

অতিরজঃ (Menorrhagia)

অনেক মেয়ে বা মহিলা মাসিক চলাকালে অতিরজঃ বা Menorrhagia সমস‌্যায় ভুগে থাকেন। অতিরজঃ বা Menorrhagia কি? এর লক্ষণ কি? এর এর হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা কি? এই সব প্রশ্নের উত্তর সম্পর্কে বিস্তারিত পড়তে নিচের বাটনে ক্লিক করুন।

মাসিক চলাকালে অতিরজঃ বিস্তারিত এখানে