অটিজম (Autism) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা

অটিজম শিশুদের অন্যতম বিকাশমূলক বৈকল্য। শিশুদের আচরণের মাধ্যমে এ সমস্যার বহিঃপ্রকাশ হয়। মনোচিকিৎসক লিও কে'কনার এ সমস্যাকে সর্বপ্রথম ১৯৪৩ সালে আলাদা একটি সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করেন এবং অটিজম নামে অভিহিত করেন। Autism শব্দটি গ্রীক Autos শব্দ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। অন্য ব্যাক্তিদের প্রতি এসব শিশুদের আগ্রহের অভাবের অবস্থা বর্ণনা করার জন্য তিনি অটিজম শব্দটি ব্যবহার করেন।

অটিজম কি? What is Autism?

অটিজম হলো গুরুতরভাবে আচরণ দক্ষতা সীমিতকারী জীবনব্যাপী বিকাশমূলক প্রতিবন্ধিতা যা শিশুর প্রথম তিন বছর বয়সের মধ্যে প্রকাশ পায় (Autism is a severely incapacitating life-long development disability which usually appears during the first three years of life-National Society for Autistic Children, 1979)।

অন্য একটি সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, অটিজম হলো পরিব্যাপক বিকাশমূলক বৈকল্য এবং ভাব বিনিময়, সামাজিক দক্ষতা ও পরিজ্ঞানমূলক ক্ষমতার স্বাভাবিক বিকাশে বিভিন্ন মাত্রার ক্ষতির দ্বারা প্রকাশ পায় (Autism is pervasive development disorder and is challanged by range of impairments in the normal development of communication, social and congnitive capacities- Cohen & Donnellan 1987)। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মাইকেল রাটার (১৯৭৮) অটিজমের চারটি প্রধান মানদণ্ডের কথা উল্লেখ করেছেন-

  1. বিলম্বিত ও ভিন্ন ধারার ভাষার বিকাশ, অর্থাৎ কথা বলতে সক্ষম হলে ভাষায় অনুপোযুক্ত প্রয়োগ, অদ্ভূত ধরনের ভাষা (অন্যের কথার পুনরাবৃত্তি)।
  2. সামাজিক বিকাশের ক্ষতি অর্থাৎ পিতামাতা, পরিবারের অন্য সদস্য বা সমাজের অন্যদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের গুরুতর ত্রুটি।
  3. বিশেষ ধারার আচরণ করার প্রবণতা, পুনরাবৃত্তিমূলক শরীর সঞ্চালন (আঙ্গুলের বিভিন্ন ভঙ্গিমা, আকস্মিক ঘোরপাক খাওয়া) বা অভ্যাসগত আচরণের প্রবণতা (যেমন- খেলনা বা আসবাবপত্র একটি নির্দিষ্ট ধারায় সাজানো)।
  4. শৈশবকালীন প্রকাশ অর্থাৎ সাধারণত: তিন বছর বয়সের মধ্যে এ সকল লক্ষণ দেখা দেয়। উল্লিখিত সংজ্ঞাগুলির আলোকে বলা যায়, অটিস্টিক শিশু সামাজিকভাবে চরম উদাসীন বা আত্মকেন্দ্রিক, পুনরাবৃত্তিমূলক বা নিজেকে উদ্দীপিত করার আচরণ নিয়ে ব্যস্ত থাকে এবং উপযোজনযোগ্য নয়, শুধু দীর্ঘমেয়াদী নিবিড় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন করা যায়।

অটিজম বিষয়ক কার্যক্রম বর্তমানে কয়েকটি ধারায় পরিচালিত হচ্ছে। যথা-

  1. অটিজমের বিজ্ঞানসম্মত শ্রেণিকরণ।
  2. অটিজমের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান এবং সে অনুযায়ী প্রতিরোধ প্রক্রিয়া নির্ধারণ।
  3. অটিজমের নিরাময় কৌশল উদ্ভাবন ও
  4. শিক্ষা-প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অটিস্টিক শিশুদের দক্ষতার উন্নয়ন করে স্বনির্ভর জীবন-যাপনের উপযোগী করে গড়ে তোলা।

অটিজমের শ্রেণিবিভাগ

অটিজম বা অটিস্টিক স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার শব্দদ্বয় মস্তিষ্ক বিকাশে কতগুলো জটিল ত্রুটিকে নির্দেশ করে। সামাজিক মিথষ্ক্রিয়া, মৌখিক ও অমৌখিক যোগাযোগ সমস্যা এবং পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ এবং মাত্রার ভিন্নতা এ ত্রুটিগুলির বৈশিষ্ট্য। আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন প্রণীত ‘ডায়োগনস্টিক এন্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়্যাল অব মেন্টাল ডিজঅর্ডারস’ (ডিএসেএম-৫, ২০১৩) তাদের ৫ম সংস্করণে সকল ধরনের অটিজমকে একই ছাতার আওতায় নিয়ে আসে।

ইতিপূর্বে (ডিএসএম-৪-টিআর) এগুলো উপভাগ যথা- অটিস্টিক ডিজঅর্ডার, চাইল্ডহুড ডিসইন্টেগ্রেশন ডিজঅর্ডার, অন্যত্র উল্লেখ হয়নি এ ধরনের পারভাসিভ ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার, এবং এসপার্জার্স সিনড্রম হিসেবে সুনির্দিষ্টিভাবে চিহ্নিত ছিল। ডিএসএম-৫ অনুযায়ী অটিজম বা অটিস্টিক স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারে প্রধান দুইটি ক্ষেত্রে অবশ্যই স্থায়ী সমস্যা থাকতে হবে, যথা- (১) দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক যোগাযোগ ও সামাজিক মিথষ্ক্রিয়ায় ঘাটতি, (২) সীমিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ।

অন্যভাবে বলা যায়- অটিস্টিক শিশুর অতীত বিকাশ পর্যায়ে বা বর্তমানে সামাজিক-আবেগীয় ভাব বিনিময়ে ঘাটতি, সামাজিক মিথষ্ক্রিয়ায় অমৌখিক যোগাযোগমূলক আচরণের ঘাটতি, এবং সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন, সংরক্ষণ বা তার গুরুত্ব অনুধাবনে ঘাটতি থাকে।

ডিএসএম-৫ অনুসারে অটিজম বা অটিস্টিক স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার ডায়োগনোসিসের জন্য শিশুর তিন বছর বয়সের পূর্বের অন্ততঃপক্ষে ৬টি বিকাশমূলক ও আচরণমূলক বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ডায়োগনোসিসের জন্য সেসকল মানদণ্ড নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

  1. বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগ এবং সামাজিক মিথষ্ক্রিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি যা বর্তমানে বা অতীত বিকাশ পর্যায়ে প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো হলো-
    1. সামাজিক-আবেগীয় ভাব বিনিময় দক্ষতার ঘাটতি, অস্বাভাবিক ধরন, এবং কথার আদান-প্রদানের ব্যর্থতা, আগ্রহ, আবেগ সমবেদনা বোধের কমতি, সামাজিক মেলা মেশার উদ্যোগ বা প্রতিক্রিয়া করার ব্যর্থতা।
    2. সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্রে অমৌখিক যোগাযোগমূলক আচরণের ঘাটতি, যেমন- মৌখিক ও অমৌখিক যোগাযোগের সমন্বয়ের অভাব বা অস্বাভাবিক দৃষ্টি বিনিময় ও অঙ্গভঙ্গি, অথবা অঙ্গভঙ্গি ব্যবহার ও বুঝার ক্ষেত্রে সমস্যা, মুখভঙ্গি বা অমৌখিক যোগাযোগের অনুপস্থিতি।
    3. সামাজিক সম্পর্ক তৈরি, রক্ষা এবং সম্পর্কের গুরুত্ব বুঝার ক্ষেত্রে সমস্যা, যেমন- বিভিন্ন সামাজিক অবস্থার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ আচরণ করা, কাল্পনিক খেলায় অংশগ্রহণ বা বন্ধুত্ব সৃষ্টির ক্ষেত্রে সমস্যা, সাথীদের বিষয়ে আগ্রহের অভাব।
  2. নিম্নবর্ণিত সীমিত আচরণ, পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ, আগ্রহ বা কর্মকাণ্ডমূলক সমস্যা যা বর্তমানে বা অতীত বিকাশ পর্যায়ে অন্তত পক্ষে দুইটি ক্ষেত্রে থাকে, যথা-
    1. একই ধরনের বা পুনরাবৃত্তিমূলক শরীর সঞ্চালন, কোন বস্তুর ব্যবহার বা কথা বলা।
    2. একই রকম থাকার বা রাখার প্রবণতা, রুটিনের প্রতি অপরিবর্তনীয় মনোভাব, বা একঘেয়ে মৌখিক বা অমৌখিক আচরণ।
    3. সীমিত, নির্দিষ্ট আগ্রহ যা মাত্রা বা আগ্রহের বিষয় হিসেবে অস্বাভাবিক।
    4. ইন্দ্রিয় উদ্দীপকের প্রতি নিম্ন বা অতিমাত্রার সংবেদনশীলতা বা কোন ইন্দ্রিয় উদ্দীপনার প্রতি অস্বাভাবিক আসক্তি।
  3. অতি শৈশবকাল থেকেই লক্ষণের প্রকাশ ঘটে (তবে প্রয়োজন না হলে লক্ষণগুলো প্রকাশের সুযোগ হয় না বা কোন কারণে অপ্রকাশিত থাকে)।
  4. লক্ষণের কারণে সামাজিক, বৃত্তিমূলক বা দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড ব্যবহারিকেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  5. প্রকাশিত লক্ষণসমূহ বুদ্ধি বিকাশজনিত প্রতিবন্ধিতার কারণে নয় অথবা সাধারণভাবে বিলম্বিত বিকাশও নয়। অনেক ক্ষেত্রে বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা ও অটিজম একত্রে থাকতে পারে, সেক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতা প্রত্যাশিত মাত্রার চেয়ে কম হলে অটিজম হিসাবে চিহ্নিত করতে হবে।

অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারের সাথে বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা, ভাষাগত সমস্যা, স্বাস্থ্যগত বা জীনঘটিত সমস্যা, অন্য কোন বিকাশমূলক সমস্যা, আচরণগত সমস্যা বা মানসিক রোগ আছে কি-না তা চিহ্নিত করে পূর্ণাঙ্গ ডয়োগনোসিস করতে হবে।

অটিজমের বিকাশ ও বৈশিষ্ট্য

শৈশব থেকেই অটিজমের লক্ষণসমূহ প্রকাশ পায়। সামাজিক মেলামেশা, সামাজিক সম্পর্কের উপযোগী ভাষা ও প্রতীকী বা কাল্পনিক খেলার বিলম্বিত বিকাশ হয় (ডিএসএম-iv-টি-আর)। অটিজমের বিকাশ ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ-

সঞ্চালন দক্ষতার বিকাশ (Motor development) : সঞ্চালনমূলক বিকাশে অটিস্টিক শিশুদের সাধারণত বিলম্ব হয় না। তবে অটিজমের সঙ্গে যদি বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা থাকে তবে সেক্ষেত্রে সঞ্চালন দক্ষতা বিকাশে বিলম্ব হয়।

ইন্দ্রিয় বিকাশ (Sensory Development) : অটিস্টিক শিশুদের সংবেদনের প্রতি অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। যেমন- দর্শন, শ্রবণ, স্পর্শ, ব্যাথা, ভারসাম্য, গন্ধ, স্বাদ ইত্যাদি। অনেকের অতি সংবেদনশীলতা কিংবা কারো নিম্নমাত্রার সংবেদনশীলতা দেখা যায়। অনেককে মনে হয় কানে শুনে না, আবার অনেককে মনে হয় চোখে দেখে না। অনেকে ব্যথা অনুভব করে না। কেউ কেউ কোনো কোনো খাদ্য মোটেও পছন্দ করে না, আবার কেউ কেউ কোনো খাদ্য অতিরিক্ত পছন্দ করে।

পরিজ্ঞানমূলক বিকাশ (Cognitive Development) : অটিস্টিক শিশুদের শিক্ষণের বিশেষত্বের কারণ তথ্য প্রক্রিয়াকরণের পরিজ্ঞানমূলক দক্ষতার ঘাটতি (গ্যালাঘার ও উইগারিংক, ১৯৭৬)। শিশুর চিন্তার অসংগতি থাকতে পারে এবং শিক্ষণ সাধারণীকরণে সমস্যা থাকতে পারে। কারো আবার বিমূর্ত (abstract thinking) চিন্তা, সচেতনতা, বিচার-বিবেচনায় কিংবা প্রতীকী ধারণা গঠনে সমস্যা হতে পারে। অনেকের অর্থহীনভাবে কোন বিষয় মুখস্থ ক্ষমতা যথেষ্ট ভালো থাকে।

আকস্মিকভাবে কোনো কিছু শিখে ফেলা (Incidental learning) অটিস্টিক শিশুদের শিক্ষণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অধিকাংশ শিশু মৃদু থেকে গুরুতর বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হয় এবং কেবলমাত্র ৩০% এর বেশি শিশুর বুদ্ধাংক ৭০ এর উপরে থাকে। অন্যভাবে বলা যায়, অনেকের আচরণগত বুদ্ধি স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকে, বাকীদের আচরণগত বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা থাকে। কোনো কোনো অটিস্টিক শিশুর বিশেষ পরিজ্ঞানমূলক যোগ্যতা দেখা যায়। যেমন- হিসাব-নিকাশ, ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তারিখ বলা, পেইন্টিং ইত্যাদি।

ভাব বিনিময় বা যোগাযোগ দক্ষতার বিকাশ (Communication Development) : কোনো কোনো অটিস্টিক শিশুর বাক বিকাশ হয় না বা যদিও হয় তবে তা অত্যন্ত নিম্নমানের ভাব বিনিময়ের উপযোগী। অটিস্টিক শিশুদের ভাষার বৈশিষ্ট্যসমূহ নীচে আলোচনা করা হলো-

  1. কথা প্রতিধ্বনি (Echolalia) : শিশুকে যা বলা হয় বা প্রশ্ন করা হয় সে তার উত্তর না দিয়ে বরং বক্তা বা প্রশ্নকর্তার কথার পুনরাবৃত্তি করে।
  2. সর্বনাম বিভ্রাট (Pronoun reversal) : এটাও সম্ভবত কথার প্রতিধ্বনি স্বভাবের ফল। এক্ষেত্রে শিশু সাধারণত ‘আমি’ শব্দ বলতে চায় না। তাকে যদি বলা হয় ‘তুমি কি খেতে চাও?’ উত্তরে সে ‘আমি খাব’ না বলে বরং বলবে ‘তুমি খাবে’। অনেক সময় নিজের নাম ধরে বলবে ‘অমুক খাবে’।
  3. বিশেষ ধারার কথা (Steriotyped phrase) : অনেকে ভাব বিনিময়ের জন্য উপযোগী নয় এমন সব শব্দ বা কথা বলে থাকে। যেমন- কোন গানের কথা, বিজ্ঞাপনের শ্লোগান, গালি বা অন্য কোনো অর্থহীন শব্দ।
  4. বিশেষ অর্থবোধক বাক্য (Jargonlike language) : প্রায়ই কোনো কোনো শিশু বাকাংশ্য বা বাক্য বলে যা অর্থপূর্ণ। কিন্তু ঐ পরিস্থিতির জন্য উপযোগী নয়। যেমন- গণনা শেখার সময় বললো ‘আকাশে পাখি উড়ে যাচ্ছে, সেগুলি খুব সুন্দর’।
  5. উপমাধর্মী কথা (Metaphorical language) : অনেকে সরাসরি কোনো একটি বক্তব্য প্রকাশ না করে বরং উপমাধর্মী শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করে। যেমন- খিদে পেলে বলে ‘ভাত নাই’।
  6. ছন্দহীন কথা (Definient prosodic patterns) : কথার মধ্যে বিরতি, উচ্চস্বর, নিম্নস্বর ইত্যাদির মাধ্যমে একটা ছন্দ প্রকাশ হয়। কিন্তু অনেক অটিস্টিক শিশুর কথায় এরূপ ছন্দ অনুপস্থিত থাকে। ফলে তারা একঘেয়েভাবে কথা বলে যায়।
  7. কথ্যভাষা বুঝার ক্ষেত্রে সমস্যা (Impaired understanding of spoken language) : প্রায় সকল অটিস্টিক শিশুর কথ্যভাষা বুঝার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা যায়। সাধারণ সরল নির্দেশ কোনো সমস্যা ছাড়া তারা বুঝতে পারে বিশেষ করে যদি কোন শারীরিক ইঙ্গিত দেয়া হয়। কিন্তু জটিল নির্দেশ প্রদান করা হলে ভুলভাবে বুঝে থাকে। যেমন- ‘ছোট চেয়ারে রাখা লাল বলটি আনো এবং তারপর দরজা বন্ধ করো’।
  8. উপযুক্ত অঙ্গভঙ্গীর অভাব (Lack of appropriate gesture) : অনেক অটিস্টিক শিশু ভাব প্রকাশের জন্য কোনো অঙ্গভঙ্গি প্রকাশ করে না। বরং শিক্ষক বা পিতা-মাতার কব্জি (হাত নয়) ধরে উদ্দিষ্ট বস্তুর দিকে নিয়ে যাওয়ায় তাদের একমাত্র অঙ্গভঙ্গী (রাটার ১৯৭৮)।

যে সকল অটিস্টিক শিশু কথা বলতে পারে তাদের সকলের উপরোক্ত সকল বৈশিষ্ট্য থাকে না, তবে কিছু বৈশিষ্ট্য প্রায় সকল অটিস্টিক শিশুর দেখা যায়। যেমন- যারা যথেষ্ট কথা বলতে পারে তারা ছন্দহীনভাবে কথা বলে, আবার যারা কম কথা বলে তারা এই ধরনের কথা বারবার বলে। মনে রাখা দরকার, প্রায় ৫০% অটিস্টিক শিশু, যাদের বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতাও থাকে তারা কখনও কথা বলতে শেখে না (কফম্ডান ১৯৭৭)।

ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিকাশ (Personal and Social Development)

শৈশব থেকে যে সামাজিক উদাসীনতা দেখা যায় তার ফলে অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রথম কয়েক মাসের মধ্যেই লক্ষ্য করা যায়, অধিকাংশ অটিস্টিক শিশু মানুষের মুখের দিকে তাকাতে আগ্রহবোধ করে না, চোখের দিকে তাকায় না বা মেলামেশায় আগ্রহী নয়। অনেককে শান্ত প্রকৃতির মনে হয়। কারণ, তারা পিতামাতার সান্নিধ্য প্রত্যাশা করে না।

তারা সহযোগিতামূলক বা অভিনয়মূলক খেলা খেলতে পারে না, কারো সঙ্গে তাদের বন্ধুত্বও গড়ে উঠে না এবং একা থাকতে চায়। বাধ্যবাধকতামূলক প্রবণতার জন্য সীমিত ধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক খেলা করে, বিশেষ কোনো জিনিসের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি দেখা যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশ পরিবর্তনে বাধা দেয়। অনেক শিশুর প্রাথামিক বিকাশ স্বাভাবিক হলেও ১৮ মাস থেকে দুই বছরের মধ্যে ক্রমান্বয়ে অর্জিত দক্ষতা লোপ পেতে থাকে।

লোভাস ও নিউসম (১৯৭৬) অটিস্টিক শিশুদের সামাজিক আচরণের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। যথা- (১) ইন্দ্রিয় ক্ষমতার আপাত ঘাটতি লক্ষ্য করা যায় অর্থাৎ শিশুর আশপাশের ঘটনার প্রতি কোনো প্রতিক্রিয়া করে না, দেখে মনে হয় সে কোনকিছু শুনছে না বা দেখছে না। (২) তারা আবেগীয়ভাবে নিস্পৃহ থাকে অর্থাৎ আদর-ভালোবাসার প্রতি কোনো প্রকার আগ্রহ প্রকাশ করে না।

কেউ আদর করলে মনে হয় তাকে চেনে না বা তার প্রতি কোনপ্রকার গুরুত্ব প্রদান করেনা। (৩) তা নিজেকে উদ্দীপিত করার মত নানা আচরণ করে অর্থাৎ অনেকে দোলাতে থাকে, কোনো জিনিস ঘোরাতে পছন্দ করে, বারবার হাততালি দেয়, আঙ্গুল পর্যবেক্ষণ করে, অথবা একই নিয়ম মেনে চলার প্রবণতা থাকে। (৪) অনেকের মেজাজ খিটখিটে প্রকৃতির হয়।

চিৎকার, কান্নাকাটি করে, হাত-পা ছোড়াছুড়ি করে, জিনিস ছুঁড়ে ফেলে কিংবা অস্থিরতা প্রদর্শন করে। নিজের ক্ষতিকর আচরণ করে। যেমন- মাথা ঠুকে, শরীর কামড়ায়, শরীর আঁচড়ায়, চোখে আঙ্গুল দিয়ে খোঁচায়। কিন্তু এসব করে কোনো ব্যথা অনুভব করে না। (৫) তারা বয়স অনুপাতিক আচরণও করতে পারে না।

উল্লিখিত আচরণগুলো বিভিন্ন মাত্রায় শিশুর মধ্যে থাকতে পারে এবং বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে তার তীব্রতা বৃদ্ধি পেতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অতি শৈশব থেকে শিশুর আচরণ ব্যতিক্রমধর্মী হয়। কিছু ক্ষেত্রে শিশুর ভাষা ও সামাজিক বিকাশ দুই বছর বয়স পর্যন্ত স্বাভাবিক হয়, কিন্তু পরে ক্রমান্বয়ে আচরণের অবনতি হয়। তাই তাদের পরিণতি ও জীবন-যাপন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অনুরূপ হয়ে থাকে।

অটিজমের হার

পূর্ববর্তী ‍হিসাবে প্রতি ১০,০০০ শিশুর মধ্যে ২-৫ জন শিশু অটিস্টিক হয় বলে মনে হতো। কিন্তু বর্তমানের বিভিন্ন জরিপে এ সংখ্যার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়েছে। অটিজমের নির্ণায়ক মানদণ্ড, সঠিক ডায়োগনোসিস কিংবা অটিস্টিক সমস্যার প্রকৃত বৃদ্ধির জন্য অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। ইউনাইটেড স্টেটস সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল-এর মতে, প্রতি ৫০০ জনে ১ জন থেকে প্রতি ১৬৬ জনে ১ জন। অন্যমতে প্রতি ১০,০০০ শিশুর মধ্যে ১৫ জন অটিস্টিক (অটিজম সোসাইটি অব আমেরিকা)।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ (আমেরিক যুক্তরাষ্ট্র) অটিজমের সতর্ক হার হিসাবে প্রতি ১,০০০ শিশুর মধ্যে ১ জন অটিস্টিক বলে মনে করে। মেয়ে শিশুদের তুলনায় ছেলে শিশুদের মধ্যে অটিজমের হার চারগুণ বেশি। পৃথিবীর সকল দেশে সকল জাতির এবং সকল আর্থ-সামাজিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে অটিজম বৈকল্য বিদ্যমান।

অটিজমের কারণ

এক সময় মায়ের সঙ্গে শিশুর সম্পর্কের প্রকৃতিকে কারণ বলে অনুমান করা হতো। কিন্তু বর্তমানের কোনো গবেষণায় মায়ের আচরণের প্রকৃতির সঙ্গে অটিজমের সম্পর্ক প্রমাণিত হয়নি। বরং শরীরতাত্ত্বিক গবেষণায় অটিজমের সঙ্গে জৈবিক সম্পর্ক পাওয়া যাচ্ছে। তবুও এ পর্যন্ত কোনো জৈবিক অবস্থাকে নিশ্চিতভাবে অটিজমের কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা যায়নি। অটিজমের কারণ সম্পর্কিত ধারণাগুলি নীচে উল্লেখ করা হলো-

স্কপলার ও ব্রিস্টল (১৯৮০) অটিজমের কারণ সম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্যাবলি বিশ্লেষণ করে নিম্নরূপ মন্তব্য করেন-

  1. কোনো নির্দিষ্ট শিশুর কোনো নির্দিষ্ট কারণ অজানা।
  2. সম্ভবত অটিজমের জন্য কোনো একটি কারণ দায়ী নয়। বরং একাধিক কারণের সমন্বয়ে অটিজম দেখা যায়।
  3. সম্ভবত অটিজমের প্রাথমিক কারণ মস্তিষ্কের গঠনগত অস্বাভাবিকতা বা জৈব রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা যা প্রত্যক্ষণ এবং বোধশক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এছাড়া অতি সাম্প্রতিক কালে জিনগত ত্রুটিকে অটিজমের কারণ হিসাবে অনুমান করা হচ্ছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, একই জাইগট থেকে জন্ম নেয়া জমজ শিশুর মধ্যে ৬০% অটিস্টিক হওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। অপরপক্ষে ভিন্ন জাইগট থেকে জন্ম নেয়া শিশুদের মধ্যে ৪% অটিস্টিক হওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। ইতিমধ্যে অটিজম সৃষ্টিকারী সন্দেহে বেশ কয়েকটি জিনকে শনাক্ত করা হয়েছে।

পারিপার্শ্বিক উপাদানের প্রভাব- পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে কোনো ক্ষতিকর উপাদান শিশুর শরীরে প্রবেশ করলে তার ফলে অটিজম দেখা দিতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। এর মধ্যে বহুল আলোচিত হলো পারদযুক্ত টিকা। মস্তিষ্কের ক্ষতির কারণ হিসাবে ভাইরাস সংক্রমণ, বিপাকক্রিয়ার ত্রুটি কিংবা মৃগীরোগকে দায়ী করা হয়।

অটিজমের প্রতিরোধ ও অটিজম শনাক্তকরণ করার উপায়

অটিজমের সুনির্দিষ্টি কারণ না জানার ফলে তাদের প্রতিরোধেরও কোনো পদক্ষেপ নেয়া যায় না।

শৈশব থেকেই অটিজমের লক্ষণসমূহ প্রকাশ পায়। যেমন- সামাজিক মেলামেশা, সামাজিক সম্পর্কের উপযোগী ভাষা ও প্রতীকী বা কাল্পনিক খেলার বিলম্বিত বিকাশ হয় (ডিএসএম iv টিআর)। শিশু বিকাশের এসব লক্ষণ দেখে অটিস্টিক শিশুদের প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা যায়। আদর্শ অটিস্টিক শিশুদের যে সকল মানদণ্ডের বিচারে চিহ্নিত করা যায়, তা হলো-

  1. সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থা।
  2. ভাব বিনিময় ক্ষমতার ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থা।
  3. সীমিত এবং পুনরাবৃত্তিমূলক পছন্দ ও ক্রিয়াকলাপ।
  4. শিশুর বুদ্ধির মাত্রা অটিজম নির্ণয়ের মানদণ্ড হিসাবে বিবেচনা করা হয় না (ডিএসএম IV টিআর)।

অটিজম শিশুদের শিক্ষার ইতিহাস

লিও কেনার কর্তৃক অটিস্টিক শিশুরা ১৯৪৩ সালে চিহ্নিত হওয়ার পর থেকে তাদের জন্য বিশেষ শিক্ষা কার্যক্রম ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা হয়ে আসছে। বিভিন্ন দেশে তাদের জন্য আলাদা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে। সুইড বাংলাদেশ ১৯৭৮ সালে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য কার্যক্রম শুরুর প্রথম পর্যায় থেকে অটিস্টিক শিশুদেরও বিশেষ শিক্ষা প্রদান করে আসছে। পরবর্তীতে আরো কয়েকটি সংগঠন এককভাবে বা অন্য প্রতিবন্ধী শিশুদের সাথে অটিস্টিক শিশুদের বিশেষ শিক্ষা প্রদান করছে।

অটিজম শিশুদের চিকিৎসা

অটিস্টিক শিশুদের উন্নয়নের বিভিন্ন কৌশলের পরিচয় পাওয়া যায়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে নিরাময়েরও দাবী করা হয়। সব পদ্ধতি যেমন বৈজ্ঞানিকভাবে কার্যকর প্রমাণিত নয় তেমনি নিরাময়ের দাবীও বিজ্ঞানসম্মত নয়। যেসব শিশুর অটিজম নিরাময় দাবী করা হয়েছে সেক্ষেত্রে শিশুর অটিজম ছিল কি-না সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞগণ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

অটিস্টিক শিশুদের চিকিৎসার কোনো নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি বা ঔষধ আবিষ্কার হয়নি। কিছু ঔষধের মাধ্যমে অটিজমের লক্ষণের তীব্রতা কমানো যায় বলে দাবী করা হয়ে থাকে। এছাড়া কিছু খাদ্য ও ভিটামিন একইরূপ উপকারী বলে দাবী করা হয়। বিশেষ করে বিষন্নতা, পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য এন্টিডিপ্রেসেন্ট ধরনের ঔষধ, গুরুতর আচরণগত সমস্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য এন্টি-সাইকোটিক ঔষধ এবং অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের জন্য স্টিমুলেন্ট ধরনের ঔষধ প্রয়োগ করা হয়।

অটিজম শিশুদের শিক্ষার বিষয়

গ্যালাঘার ও উইগারিংক (১৯৭৬) অটিস্টিক শিশুদের শিক্ষা বিষয়ে বলেন-

  1. অটিস্টিক শিশুরা শিক্ষণযোগ্য।
  2. তাদের শিক্ষণের বিশেষত্বের কারণ হলো তথ্য প্রক্রিয়াকরণের পরিজ্ঞানমূলক দক্ষতার ঘাটতি।
  3. পরিজ্ঞামূলক দক্ষতার এই ঘাটতি পরিকল্পিত শিক্ষা কার্যক্রম যা বিকাশমূলক শিক্ষাধারা অনুসরণ করে এবং বলবর্ধন প্রদান নীতিভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে পূরণ সম্ভব হতে পারে।
  4. পিতামাতা বা পিতামাতার অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক প্রাথমিক শিক্ষক হিসাবে জীবনের শুরু থেকে পরিকল্পিত শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করা আবশ্যক।

অটিস্টিক শিশুদের শিক্ষাক্রমে যে সকল বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা যায় তা হলো-

  1. আত্মপরিচর্যামূলক দক্ষতা : নিজের প্রয়োজনীয় দক্ষতাসমূহ শিক্ষা দেয়া হয় যাতে ব্যক্তিগত জীবনে স্বনির্ভর হতে পারে।
  2. ভাব বিনিময় দক্ষতা : শিশুকে যথাযথ পদ্ধতিতে কথা ও ভাষা শেখানো সম্ভব হলে অবশ্যই তা শেখাতে হবে। কিন্তু তা সম্ভব না হলে বিকল্পভাবে ভাব বিনিময় কৌশল শেখাতে হবে।
  3. লেখাপড়ার দক্ষতা : প্রায়োগিক বা প্রাথমিক পর্যায়ের লেখা, পড়া, অংক ইত্যাদি বিষয় শিশুদের শিক্ষা দেয়া যায়। সক্ষমতা অনুযায়ী যেকোন স্তরের লেখাপড়া শিক্ষা দেয়া যেতে পারে। বিশেষ করে কোনোৃ বিশেষ দক্ষতা থাকলে সে বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে। যেমন- শিল্পকলা ইত্যাদি।
  4. ব্যবহারিক-জীবনমুখী দক্ষতা : বৃত্তিমূলক দক্ষতাসহ সামাজিক জীবনে চলার মত আচরণগত দক্ষতা অর্জনের উপযোগী শিশুদের শিক্ষা দেয়া যায়।
  5. অবাঞ্ছিত আচরণ দূর করা : অটিস্টিক শিশুরা সাধারণত কিছু কিছু অবাঞ্ছিত আচরণ করে। যেমন- পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ, মাথা ঠুকা, অস্থিরতা ইত্যাদি আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা।

অটিস্টিক শিশুদের থেরাপিসমূহ

অটিস্টিক শিশুদের নিরাময়মূলক পদ্ধতি হিসাবে কিছু থেরাপি প্রবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু এ সকল পদ্ধতি উল্লেখযোগ্যভাবে কার্যকরী হিসাবে বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণিত হয়নি এবং সর্বজনগ্রাহ্যও হয়নি। এরূপ কয়েকটি থেরাপির বর্ণনা নীচে দেওয়া হলো-

  1. সেনসরী ইন্টিগ্রেশন থেরাপি : ইন্দ্রীয়সমূহ হতে প্রাপ্ত সংবেদনসমূহ কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে সমন্বয় সাধিত হলে শিশু উপযুক্ত আচরণ করতে পারে। কিন্তু মস্তিষ্কের কোনো প্রকার ত্রুটির কারণে এ সমন্বয় সাধন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় বলে অকুপেশনাল থেরাপিস্টগণ মনে করেন। ফলে তারা সঠিক প্রত্যক্ষণ বা সঠিক আচরণ করতে পারে না। এ ধরনের সমস্যার জন্য অকুপেশনাল থেরাপিস্টগণ সেনসরী ইন্টিগ্রেশন থেরাপি প্রদান করেন। যেমন- শিশুকে দোল খাওয়ানো, গড়ানো, ঘোরানো, লাফ দেয়া ইত্যাদি। এ কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য হলো মস্তিষ্কে সংবেদন সংগঠন ও প্রক্রিয়াকরণের উন্নতি ঘটানো। সেনসরী ইন্টিগ্রেশন থেরাপি প্রয়োগে কিছু অটিস্টিক শিশু উপকৃত হয়, কিছু সামান্য উপকৃত হয় আবার অনেকে কোনোভাবে উপকৃত হয় না (আইরেস ১৯৭৯)।
  2. আরলিন লেন্স ব্যবহার : শিক্ষণে অক্ষম শিশুদের জন্য এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। দর্শন উদ্দীপনার প্রতি সংবেদনশীল অটিস্টিক শিশুদের এক ধরনের রঙিন লেন্সযুক্ত চশমা ব্যবহার করতে দেয়া হয়। ডোনা ইউলিয়ামস এ পদ্ধতি জনপ্রিয় করে তোলেন। এছাড়া প্রিজম লেন্সও কোনো কোনো ক্ষেত্রে অটিস্টিক শিশুদের ব্যবহার করতে দেয়া হয়।
  3. প্লে-থেরাপি : প্লে-থেরাপি এক ধরনের সাইকোলজিক্যাল কৌশল। অ্যানা ফ্রয়েড আবেগীয় সমস্যাগ্রস্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য মনোঃসমীক্ষণ পদ্ধতি শিশুদের ক্ষেত্রে প্রয়োগের জন্য এ পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। পরবর্তীতে অন্যান্য মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্বের আলোকে প্লে-থেরাপি প্রয়োগ করা হয়। এখানে খেলাকে প্রধান মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করে থেরাপিস্টের সাথে সম্পর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে সম্পর্কগত ও আবেগীয় সমস্যা দূর করা হয়। এছাড়া শিশুর ভাষাগত এবং জ্ঞানগত বিকাশে প্লে-থেরাপি সহায়তা করে থাকে।
  4. হোল্ডিং থেরাপি : মার্থা ওয়েলস-এর মতে, শিশুর সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক সৃষ্টির ব্যর্থতার ফলে অটিজম দেখা দেয়। এ দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে মা কর্তৃক শিশুকে যথেষ্ট চাপে জড়িয়ে ধরার পদ্ধতি হলো হোল্ডিং থেরাপি। টেম্পল গ্রন্ডিং এবং বার্নার্ড রিমল্যান্ড এর মতে, হোল্ডিং থেরাপির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে ইন্দ্রিয় উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিক কোনো প্রাপ্তি ঘটে না।
  5. অডিটরী ইন্ট্রিগ্রেশন ট্রেনিং : শ্রবণ সংবেদনশীলতা পরিবর্তনের একটি কৌশল হলো অডিটরী ইন্টিগ্রেশন ট্রেনিং। এ পদ্ধতি প্রকৃতপক্ষে শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা প্রতিরোধের জন্য উদ্ভাবন করা হয়েছিল। এ পদ্ধতি একজন অটিস্টিক শিশুর উপর প্রয়োগ করে তাকে নিরাময় করা যায়নি, কিছু ক্ষেত্রে আচরণের কিছুটা পরিবর্তন সম্ভব হয়। বিশেষ করে যেসব অটিস্টিক শিশুর শব্দের প্রতি তীব্র অসহনশীলতা দেখা যায় তাদের সমস্যা কমানো যায় এবং অন্যান্য অটিস্টিক লক্ষণও কমানো সম্ভব হয়েছে। এ পদ্ধতিতে যান্ত্রিক উপায়ে বিভিন্ন ধরনের সংগীত শোনানোর মাধ্যমে শব্দের প্রতি সহনশীলতা বাড়ানো হয়।
  6. অপশন মেথড : নেইল কফম্যান এবং তার স্ত্রী সুজি কফম্যান তাদের অটিস্টিক শিশুর অটিজম নিরাময়ের জন্য বিশেষ এক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন এবং তাদের মতে তাদের শিশুকে নিরাময় করেন। এ পদ্ধাতি বর্তমানে ‘অপশন মেথড’ নামে পরিচিত। এ পদ্ধতির দর্শন হলো শিশুর জগতে প্রবেশ করা। শিশুকে শর্তহীন ভালোবাসা এবং স্বাধীনতা দিয়ে শিশুকে সাহায্য করা। এখানে শিশু পরিচালকের ভূমিকায় থাকে। শিক্ষকগণ প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা করে শিশুকে সান্নিধ্য দেন। এভাবে শিশুকে স্বাভাবিক আচরণ করতে এবং অটিস্টিক জগত থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করা হয়। এ পদ্ধতির কার্যকারিতা বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণিত নয়।

ডিসক্রিট ট্রায়াল টিচিং-ডিটিটি (Discrete Trial Teaching - DDT)

ডিসক্রিট ট্রায়াল টিচিং-ডিটিটি (Discrete Trial Teaching - DDT) একটি দক্ষতানির্ভর কৌশল যেখানে কোনো কাজের জন্য দক্ষতাকে ভেঙ্গে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং ক্রমে সবগুলি দক্ষতা মিলে একটি পূর্ণাঙ্গ কর্ম-দক্ষতা তৈরি হয়। এটি শিখনের আচরণিক তত্ত্বগুলোর মূলনীতি এবং এবিএ'র উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। ‘ডিটিটি’ ছোট শিশু অর্থাৎ দুই বছর বয়সী শিশু থেকে শুরু করে পূর্ণবয়স্ক অটিস্টিক ব্যক্তি পর্যন্ত যাদের মৃদু থেকে তীব্র মাত্রায় অটিজম থাকে তাদের উপর প্রয়োগ করা যায় এবং মৃদু থেকে তীব্র মাত্রার অটিজম আক্রান্ত সব বয়সী ব্যক্তিরাই এই কৌশল প্রয়োগের ফলে উপকৃত হতে পারে।

জ্ঞানীয় অথবা বাস্তবিক সামর্থ্যের দিক থেকে বিবেচনা করলে বলা যায়, তীব্র বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা থেকে মধ্যম মাত্রার বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতার মধ্যে অবস্থানকারী ব্যক্তিরা এই ডিটিটি কৌশলের আয়ত্বে আসতে পারে। বুদ্ধি প্রতিবন্ধি ব্যক্তি থেকে শুরু করে গড় বুদ্ধিমাত্রা উপরের ব্যক্তিদের উপর এটি প্রয়োগযোগ্য। বিকাশগত প্রতিবন্ধিতা রয়েছে এমন শিশুদের উপর ‘ডিটিটি’ ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হয়, বিশেষ করে অটিজম আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে এর ব্যবহার অনেক বেশি মাত্রায় লক্ষ্য করা যায়।

অনেকেই ‘ডিটিটি’কে অপর প্রশিক্ষণ কৌশল ‘এবিএ’ এর সাথে গুলিয়ে ফেলে এবং দুইটিকে একই প্রকার পদক্ষেপ বলে মনে করে। আসলে এই দুইটি পদ্ধতিগতভাবে এক হলেও তারা ভিন্ন জিনিস। ডিটিটি হলো আচরণ ভিত্তিক একটি একক চক্র যা নির্দেশনার উপর নির্ভরশীল অর্থাৎ কেবল আদিষ্ট হলেই শিশু কোনো একটি ক্ষুদ্র আচরণ প্রদর্শন করে। কোনো দক্ষতা সম্পূর্ণভাবে অর্জিত হওয়ার জন্য আদেশের সাথে এই আচরণ একাধিক্রমে বহু বার, দিনের বিভিন্ন সময়, কয়েক দিন ধরে এমনকি মাসাধিক কালও চলতে পারে। অপর দিকে ‘এবিএ’ একই ধরনের ক্ষুদ্র কোনো আচরণ আয়ত্ত করার জন্য শিশু স্বতস্ফূর্তভাবে আচরণ করে। এখানে পার্থক্য হলো যে, শিশু কোনো বলবর্ধক পাওয়ার আশায় আদেশ ছাড়াই নির্দিষ্ট আচরণ সম্পাদন করে।

ডিটিটি'র প্রয়োগ কৌশল

ডিটিটি শিশুদের নতুন দক্ষতা শিখতে সাহায্য করে। ট্রায়াল বলতে এই কৌশলে একটি “একক শিখন প্রচেষ্টাকে” বোঝায় যেখানে এই উপাদানগুলো থাকে। একটি উদ্দীপনার উপস্থাপন (যেমন: শিক্ষকের শিক্ষণ), শিশুর প্রতিক্রিয়া এবং এর ফলশ্রুতি।

এই কৌশলে সমগ্র কাজকে ভেঙ্গে অনেকগুলি সহজ ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বোধগম্য কাজে ভাগ করে নেয়া হয়। যেমন, শার্ট পরার জন্য প্রথমে শার্টটি ঠিকমত ধরা, তারপর ডান হাত ঢোকানো, তারপর বাম হাত ঢোকানো, এরপর শার্টকে গায়ে ঠিকমত তুলে নেওয়া এবং সর্বশেষে শার্টের বোতাম লাগানো। এখানে প্রতিটি কাজের ভগ্নাংশ সম্পাদন করার জন্য নির্দেশ দেওয়া এবং তা সম্পন্ন হলে শিশুকে কেনো বলবর্ধক দেওয়া। শিশুটি যদি ঐ কাজটি সঠিকভাবে করতে পারে তারপর তাকে কয়েক সেকেন্ড বিশ্রাম দেওয়া হয়।

এভাবে বিশ্রাম ‍দিয়ে কয়েক বার প্রশিক্ষণ করলে শিশুর পক্ষে ঐ আচরণ শিখে নেওয়া সহজ হয়। শিক্ষণ বা ট্রায়াল শেষে শিশুর প্রতিক্রিয়া বা উত্তর জানা হয় এবং সেটিকে সঠিক বা ভুল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সবশেষে সেই প্রতিক্রিয়ার ফলস্বরূপ কোনো উপাদান বা বলবর্ধন প্রদান করা হয়। ডিটিটি কৌশলের মাধ্যমে নির্ভুল শিখন, শেপিং, মডেলিং ফেডিং, সংশোধন, বলবর্ধন ইত্যাদি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। একদিক্রমে বহুদিন পর্যন্ত এই কৌশল চালিয়ে যেতে হয় যাতে শিশু তার কাজে পারদর্শী হয়ে উঠতে পারে।

ডিটিটির কার্যকারিতা নির্ণয়ের জন্য প্রথমে শিশুর অর্জিত দক্ষতা ও তার পছন্দ-অপছন্দ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয় এবং নিয়মিত তার অর্জিত দক্ষতার অবস্থা পরিমাপ করা হয়। কোনো দক্ষতা শিক্ষণের পূর্বে ঐ দক্ষতায় শিশুর অবস্থা কী প্রথমে তা জেনে নেওয়া হয়। এরপর প্রতিটি সেশনে ট্রায়ালের বিপরীতে শিশুর প্রতিক্রিয়া কী সেই বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এই তথ্যগুলো নিয়মিত বিশ্লেষণ করে শিশুর অগ্রগতি সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা পায়। এই তথ্য শিশুর শিক্ষার জন্য কোনো ধরনের পদ্ধতি এবং কোনো শিশুর জন্য কী বেশি কার্যকর তা নির্ধারণেও সাহায্য করে।

ডিটিটি'র উপকারিতা এবং প্রভাব

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে ডিটিটি প্রয়োগে শিশুর নানাবিধ উপকার হয়। এটি শিশুকে নতুন আচরণ শিখনে, বিশেষ করে ভাষা, নড়াচড়া ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঞ্চালন, অনুকরণ ও খেলাধুলা, সামাজিক আচরণ, আবেগ প্রকাশ, ইত্যাদি শিখনে খুবই কার্যকর ভূমিকা রাখে। শুধু তাই নয়, এটি শিশুর মধ্যে আগ্রাসী ও আক্রমণাত্মক আচরণ নিয়ন্ত্রণে বেশ সহায়ক হয়। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এই কৌশলের অন্তর্গত শিশুদের মধ্যে অনেকেই সার্থকভাবে মূল ধারায় শিক্ষাব্যবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে, এমনকি যেসব শিশুর বুদ্ধিমত্তার মাত্রা আইকিউ স্কেলে ৭০ এর কম তাদের ৫০% এই পদ্ধতি শেষে সাধারণ মূল ধারার শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত হতে পেরেছে এবং বাকিদেরও অনেক উন্নতি ঘটেছে।

যদিও বিশেষজ্ঞরা অটিজম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নানা ধরনের দক্ষতা বিকাশে ডিটিটির উপকারিতার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন তবুও অনেকে এটাও মনে করেন যে, বিচ্ছিন্নভাবে শুধু ডিটিটির ব্যবহার তেমন কোনো উপকারিতা বয়ে আনে না। যেহেতু অটিজম আক্রান্ত শিশুদের শিখন স্টাইল ভিন্ন এবং প্রত্যেকেরই নিজস্ব সাফল্য ও দুর্বলতা রয়েছে, তাই বিচ্ছিন্নভাবে শুধু ডিটিটির ব্যবহার খুব একটা ফলপ্রসূ হয় না এবং সে কারণে খুব দীর্ঘ-সময় ধরে নিবিড়ভাবে এই কৌশলটি প্রয়োগের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

পিভোটাল রেসপন্স ট্রেনিং পিআরটি (Pivotal Response training-PRT)

এবিএ এবং ডিটিটির মত এটিও একটি দক্ষতানির্ভর কৌশল। প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ের শিশু থেকে পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তি পর্যন্ত যাদের তীব্র থেকে মৃদু মাত্রার অটিজম রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে এটি প্রয়োগযোগ্য। মৃদু বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য এটি প্রযোজ্য, তবে যাদের ভাষা ব্যবহারের দক্ষতা বিশেষ করে ভাষা অনুধানব এবং প্রকাশের নূন্যতম সামর্থ্য রয়েছে তারাই পিআরটি কৌশল ব্যবহারে বেশি লাভবান হয়ে থাকে।

এই কৌশলটির লক্ষ্য হলো গুরুত্বপূর্ণ এমন কোনো আচরণ যা অন্যান্য অসংখ্য আচরণকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। অর্থাৎ ঐ আচরণের কারণে শিশুর অন্যান্য আচরণ আয়ত্ত করতে অসুবিধা হয় অথবা আদৌ সেগুলি আয়ত্ত করতে পারে না এমন ক্ষেত্রে মূল আচরণকে শিক্ষার জন্য পিআরটি ব্যবহার হয়। এই আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারলে তা অন্যান্য অনেক আচরণের পরিবর্তন আনতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। পিআরটি কৌশলের প্রধান উদ্দেশ্য হলোঃ

  1. প্রাকৃতিক পরিবেশে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে এমন শিখনের সুযোগ করে দেওয়া এবং শিশুকে সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় সমর্থ করে তোলা।
  2. পিআরটি কৌশল প্রয়োগকারী তত্ত্বাবধায়কের প্রয়োজন কমিয়ে আনা, এবং
  3. যেইসব পরিসেবাগুলি শিশুকে প্রাকৃতিক বা স্বতঃস্ফুর্তভাবে পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে সেগুলি কমিয়ে আনা।

তাই বলা যায়, পিআরটির প্রাথমিক বা মূল লক্ষ্য হলো শিশুকে এমন সামাজিক ও শিক্ষাগত দক্ষতা প্রদান করা যা তাকে প্রাকৃতিক বা স্বতঃস্ফূর্ত পরিবেশে স্বাধীনভাবে অন্যের সাহায্য ছাড়াই সার্থকভাবে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করবে।

পিআরটি পদ্ধতিটি এবিএর মূলনীতি অনুসরণ করে চলে। কারণ এতে নেতিবাচক বিশেষ কোনো মিথস্ক্রিয়া থাকে না। এই পদ্ধতিতে কৃত্রিম উদ্দীপকের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা হয় এবং প্রধানত পরিবারকেন্দ্রিক। ফলে এর সার্বক্ষণিক প্রয়োগের একটি নিশ্চয়তা থাকে। পিআরটিতে শিশুকে প্রাকৃতিক বা স্বতঃস্ফূর্ত পরিবেশে এমন আচরণ শিখানো হয় যেগুলি তার বয়সপোযোগী এবং শিশুর জন্য বলবর্ধক হিসেবে কাজ করে। এক্ষেত্রে শিশুর যোগাযোগ দক্ষতা বিকাশে বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়। এই প্রশিক্ষণ কৌশলে যেসব মূল দক্ষতা বিকাশের ওপর জোর দেওয়া হয় সেগুলি হলোঃ

  1. বহুমুখী উদ্দীপকের প্রতি সাড়া প্রদান করেনা।
  2. শিশুর প্রেষণা বৃদ্ধি।
  3. শিশুর আত্ম বা স্ব-ব্যবস্থাপনা ক্ষমতা বাড়ানো।
  4. স্ব-উদ্যেগমূলক আচরণ বাড়ানো।

পিআরটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলি বিশেষভাবে লক্ষ রাখতে হবে। সেগুলি হলোঃ

  1. প্রশিক্ষণ নির্দেশনা হতে হবে স্পষ্ট এবং কাজটি করতে দেয়া হচ্ছে সেটি যেন উপযুক্ত, বাধাহীন এবং শিশুর মনোযোগ ধরে রাখতে সমর্থ্য হয়। এ ক্ষেত্রেও অভিভাবক বা শিক্ষক শিশুকে একটি একটি করে প্রশিক্ষণ প্রদান করবেন এবং এমন কিছু করবেন যেটি দিয়ে শিশুর প্রতিক্রিয়া জানা যায়। এরপর শিশু সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া করবে এবং সবশেষে তার একটি বলবর্ধক থাকবে।
  2. যেসব কাজ শিশু করতে শিখে গেছে সেগুলিকে নতুন দক্ষতা বা কাজের সাথে মিলিয়ে দিতে হবে।
  3. কাজ বা দক্ষতাগুলোকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশুকে বেছে নিতে দিতে হবে।
  4. প্রশিক্ষণ, নির্দেশনা বা প্রশ্নে অনেক ধরনের উপাদান বর্তমান থাকবে। যেমন: শারীরিক, মানসিক বা আবেগিক ইত্যাদি।
  5. পিআরটি ব্যবহারে আরও খেয়াল রাখতে হবে যে, শিশু কোন বস্তু নিয়ে কাজ করতে আগ্রহ দেখায়, পরিবেশের প্রতি তার যেন একটি নূন্যতম মনোযোগ থাকে এবং পিআরটি প্রশিক্ষণের পূর্বেই যেন তার কিছু প্রাথমিক অনুকরণ দক্ষতা বিকশিত হয়।
  6. পিআরটি প্রয়োগের জন্য সবচেয়ে উপযোগী শিশু হলো তারা যাদের খেলনার প্রতি আগ্রহ আছে এবং বস্তুর উপস্থিতি ছাড়াই যারা কিছু আত্ম-উদ্দীপনামূলক আচরণ প্রদর্শন করে থাকে।

পিআরটি কার্যকারিতা নিরূপণে স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদী আচরণিক বহিঃপ্রকাশ দেখা হয়। এক্ষেত্রে ‘এনেকডটাল’ রেকর্ড, সামাজিক এবং গোত্রীয় পর্যায়ের (কমিউনিটি) কাজে অংশগ্রহণ ও আচরণের গুণগত মান উন্নয়ন এবং ‘এডাপটিভ বিহেভিয়ার স্কেল’ প্রয়োগের ফল, ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও শিশুর অগ্রগতি পরিমাপ করার জন্য তার কোনো লক্ষ্য বা টার্গেট আচরণ, যেমন: ভাষা বা খেলার দক্ষতা, সম্পর্কেও তথ্য নেয়া যেতে পারে।

পিআরটির উপকারিতা ও প্রভাব: পিআরটি শিশুর প্রেষণা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে যা শিশুর ভাষাগত দক্ষতার বিকাশে খুব সহায়ক। গবেষণায় দেখা গেছে পিআরটি প্রয়োগে শিশু পরিস্থিতি বুঝে সেই অনুযায়ী সহপাঠী ও অন্যদের সাথে অর্থপূর্ণভাবে ভাষা ব্যবহার করে যোগাযোগে সক্ষম হয়। পিআরটি প্রশিক্ষণের ফলে শিশু দীর্ঘবাক্য ব্যবহার করে কথা বলতেও সক্ষম হয়। চোখে চোখ রেখে যোগাযোগ করার হারও বেড়ে যায়। শুধু ভাষা বা যোগাযোগ দক্ষতা নয়, পিআরটি শিশুর খেলার দক্ষতা, বিশেষ করে সঞ্চালনমূলক খেলা এবং প্রতীকি খেলার বিকাশেও সহায়ক হয়। এই প্রশিক্ষণ কৌশল ব্যবহারে এখন পর্যন্ত কোনো বিরূপ প্রক্রিয়ার নজির পাওয়া যায়নি।

গর্ভবতী মায়ের যত্ন

১। গর্ভবতী মায়ের খাদ্য ও পুষ্টি সম্পর্কে আলোচনা কর। মায়ের অপুষ্টিতে সন্তানের কি কি ক্ষতি হতে পারে?
২। গর্ভকালীন সময়ে কয়েকটি পরীক্ষা বর্ণনা কর।
৩। গর্ভকালীন “ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা” ও কি কি কারণে গর্ভাবস্থায় ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়- বুঝিয়ে লিখ।

গর্ভবতী মায়ের যত্ন সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন এখানে

প্রসবকাল, নিরাপদ মাতৃত্ব, প্রসবকালীন বিষয়াদির প্রভাব

১। সন্তানের প্রসবকাল কিভাবে নির্ধারণ করা হয়? প্রসবকালীন স্তর, বৈশিষ্ট্য এবং প্রভাবিত বিষয়াদি সম্পর্কে লিখ।
২। প্রসব কয় প্রকারের হয়? প্রত্যেক প্রকার প্রসবের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে লিখ।
৩। প্রসবকালীন জটিলতার মধ্যে মস্তিস্কের আঘাত কেন সবচেয়ে ক্ষতিকর? কিভাবে ক্ষতি হতে রক্ষা পাওয়া যায়?
৪। নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য কি কি বিষয় জানা আবশ্যক, আলোচনা কর।

প্রসবকাল, নিরাপদ মাতৃত্ব, প্রসবকালীন বিষয়াদির প্রভাব

নবজাতকের স্বাস্থ্য রক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিমাপ, শিশুর নাভিরজ্জু কাটা

১। শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর কি কি স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত তা আলোচনা কর?
২। নবজাতকের যত্ন সম্পর্কে আলোচনা কর।
৩। নবজাত শিশুর কয়েকটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা তুলে ধর। এই সমস্যার সমাধান কিভাবে করবে?
৪। অপরিণত শিশু কাকে বলে? অপরিণত শিশুর কয়েকটি সমস্যার উল্লেখপূর্বক বর্ণনা কর।
৫। APGAR-স্কোর সম্পর্কে আলোচনা কর। এর গুরুত্ব কি?

নবজাতকের স্বাস্থ্য রক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিমাপ, শিশুর নাভিরজ্জু কাটা বিস্তারিত এখানে পড়ুন

শিশু জন্মের পর পরিচর্যা সম্পর্কে জানুন

শিশু জন্মের পর তার কি ধরনের পরিচর্যা করতে হয়? এ ব‌্যাপারে আমরা অনেকেই জানিনা। শিশু জন্মের পর তার সঠিক পরিচর্যা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর স্বাস্থ‌্যের যত্ন, শিশুর কাপড় ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, শিশুকে দুধ খাওয়ানোর নিয়ম, শিশুর ঘুমানোর নিয়ম, শিশুর মলত‌্যাগ করার নিয়ম, শিশুর দাঁত পরিষ্কার করা ইত‌্যাদি বিষয়ে সচেতন হতে হবে। তাই সচেতন মা-বাবা হিসেবে প্রত‌্যেক পিতা-মাতার শিশু জন্মের পর পরিচর্যা সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা প্রয়োজন।

শিশু জন্মের পর পরিচর্যা সম্পর্কে জানুন

নবজাতকের খাবার - মায়ের বুকের দুধ

নবজাতকের খাবার - মায়ের বুকের দুধ। নবজাতক শিশুকে তার মায়ের বুকের দুধ কেন খাওয়াবেন? শিশুকে দুধ খাওয়ানোর নিয়ম কি? শিশুকে দুধ খাওয়ানোর প্রয়োজনীয়তা কি? নবজাতকের খাবার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে এখানে।

নবজাতকের খাবার - মায়ের বুকের দুধ

শিশু লালন পালন বিষয়ক উপদেশ

শিশুদের সেবা-যত্ন কিভাবে করতে হয়? শিশুদের শিক্ষা-দীক্ষা কি? শিশুর আদব-কায়দা কি? শিশুর পোষাক পরিচ্ছদ কি? শিশুর ন‌্যাপকিন কিভাবে ব‌্যবহার করবেন? এখানে শিশু লালন পালন বিষয়ক কিছু উপদেশ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। প্রত‌্যেক পিতা-মাতার এ বিষয়গুলো নিয়ে সচেতন ভূমিকা পালন করা উচিত।

শিশু লালন পালন বিষয়ক উপদেশ

শারীরীক প্রতিবন্ধিতা কি? বিভিন্ন ধরনের শারীরিক প্রতিবন্ধিতা

সীমিত অর্থে শারীরীক প্রতিবন্ধিতা (Physical disability) বিভিন্ন ধরনের সঞ্চালনমূলক প্রতিবন্ধিতা (Motor disability)- এর সমন্বিত অবস্থা। দৈনন্দিন জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সমবয়সীদের মত শারীরীক কর্মকান্ড বিশেষ সাহায্য ব্যতিরেখে করার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা হল শারীরিক প্রতিবন্ধিতা। শারীরিক প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে অন্য কোন ধরনের প্রতিবন্ধিতা যুক্ত থাকতে পারে। শারীরিক প্রতিবন্ধি শিশুদের বুদ্ধি স্বাভাবিক থাকতে পারে, কম থাকতে পারে কিংবা গড়ের বেশিও থাকতে পারে। শারীরিক প্রতিবন্ধিতা জন্মগত বা রোগ বা দুর্ঘটনা দ্বারা অর্জিত হতে পারে এবং তা মৃদু বা গুরুতর হতে হবে। শারীরিক প্রতিবন্ধিতা শিশুর শিক্ষা গ্রহণ ক্ষমতাকে সীমিত করতে পারে। সে কারণে অনেকের বিশেষ শিক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।

শারীরীক প্রতিবন্ধিতা কি? বিভিন্ন ধরনের শারীরিক প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন এখানে

দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা কি? এর শ্রেণিবিভাগ, বিকাশ ও বৈশিষ্ট্য

চেখের গঠন বা কার্যকারিতার ত্রুটির কারণে শিশুর দৃষ্টিক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা (Visual Impairment) বলতে শিশুর দৃষ্টিক্ষমতার সে পরিমাণ ক্ষতিকে বুঝায় যেক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষা উপকরণ অথবা শিক্ষার পরিবেশের পরিবর্তন করা না হলে শিশুর সর্বোচ্চ শিক্ষণ ও সাফল্য অর্জন সম্ভব হয় না (ব্যারাগা ১৯৮৩)।

দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা কি? এর শ্রেণিবিভাগ, বিকাশ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন এখানে

শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা কি? শ্রবণ প্রতিবন্ধিতার শ্রেণিবিভাগ

কান ও শ্রবণ সংবেদন পরিবাহী অঙ্গের কোন প্রকার ক্ষতির জন্য শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা দেখা দেয় এবং শ্রবণ প্রতিবন্ধিতার মাত্রাভেদে কথা শোনা ও কথা বলার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয়। ‘শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা (Hearing Impairment)’ বলতে মৃদু থেকে চরম পর্যন্ত যেকোন মাত্রার শ্রবণ অক্ষমতাকে বুঝায়। এর আওতায় বধির মাত্রার শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা ও আংশিক মাত্রার শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা এ দুই উপ-বিভাগ অন্তর্ভুক্ত (ব্রিল, ম্যকনেইল ও নিউম্যান-১৯৮৬)।

শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা কি? শ্রবণ প্রতিবন্ধিতার শ্রেণিবিভাগ সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন এখানে